সরকারি পিয়ন পদে উচ্চশিক্ষিতের আবেদন, সংকটে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান

সরকারি পিয়ন পদে উচ্চশিক্ষিতের আবেদন, সংকটে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক (পিয়ন) পদে নিয়োগের জন্য বিপুলসংখ্যক উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীর উপস্থিতি আবারও দেশের কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি পুরোনো সংকটকে সামনে এনেছে। স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমনকি আরও উচ্চতর ডিগ্রিধারীদেরও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করতে দেখা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান এক কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।

গত দুই দশকে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও কর্মসংস্থানের সঙ্গে এর কার্যকর সংযোগ এখনো গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে দেশে ৫৮টি পাবলিক, ১১৬টি বেসরকারি এবং দুটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩ অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫১ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে; এর মধ্যে শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই রয়েছে ৩৩ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। একই বছরে প্রায় পাঁচ লাখ ৯৫ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মবাজারে প্রবেশ করছে। অথচ চাকরির বাজার সেই হারে সম্প্রসারিত হয়নি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তাদের প্রতিবেদন অনুসারে ২০২৪ সালে দেশে বেকারেরর সংখ্যা ২৭ লাখ।

এ ছাড়া, কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স ২০২৫-এ চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে বাংলাদেশের স্কোর কেবল ৩৯। বিশ্বের ৮১ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৭তম। এই চিত্র স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, উচ্চশিক্ষার পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও গুণগত মান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষিত বেকারের সংকট আরও গভীর হবে।

দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে দক্ষ মানবসম্পদ, শিল্পায়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। ফলে উচ্চশিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। সরকারি চাকরির সীমিত সংখ্যক পদকে কেন্দ্র করে লাখো তরুণের প্রতিযোগিতা এই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে  প্রায় ১০ বছর চাকরির অভিজ্ঞতায় দেখেছি, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর এসব পদে আবেদনকারীদের বড় অংশই পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। বিদ্যমান নিয়োগবিধিতে সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক আবেদনকারী প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করেন না। পরে চাকরিতে যোগদানের পর উচ্চতর ডিগ্রির ভিত্তিতে পদোন্নতি বা অন্য প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার আবেদন করেন। এই প্রবণতা নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন করে, সমতা নষ্ট করে এবং সরকারের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যয়ও বাড়ায়।

আরও পড়ুন

তাই সরকারি চাকরির নিয়োগে সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার সীমাবদ্ধতা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। শিক্ষাগত যোগ্যতা গোপনের পরিবর্তে আবেদনকারী যেন তার প্রকৃত যোগ্যতা প্রকাশ করতে পারেন সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার কথা গুরুত্ব পেয়েছে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)ও উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ, শিল্প-অ্যাকাডেমিয়া সংযোগ, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ‘টু প্লাস টু’ মডেল, যৌথ ডিগ্রি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের প্রস্তুতিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে শুধু সনদনির্ভর না রেখে দক্ষতানির্ভর করতে হবে। অন্তত দুটি আন্তর্জাতিক ভাষা শেখার সুযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং শিল্পখাতের চাহিদাভিত্তিক ট্রেড বা ভোকেশনাল কোর্সকে পাঠ্যক্রমের অংশ করা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে বাস্তব কর্মবাজারের সংযোগ যত শক্তিশালী হবে, ততই বেকারত্ব কমবে।

এক্ষেত্রে ইউজিসি কয়েকটি বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিতে পারে। প্রথমত, জাতীয় পর্যায়ে একটি ইন্টার্নশিপ পোর্টাল চালু করা যেতে পারে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীরা একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকবে। দ্বিতীয়ত, শিল্প ও সেবাখাতে কী ধরনের জনবল প্রয়োজন, কী যোগ্যতা ও দক্ষতা লাগবে- এসব তথ্য নিয়ে একটি ন্যাশনাল স্কিলস অ্যান্ড জব ডিমান্ড পোর্টাল গড়ে তোলা যেতে পারে। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় জব পোর্টাল চালু করে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের সঙ্গে তা যুক্ত করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষার্থীদের জন্য সহজ শর্তে সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদের শিক্ষা ঋণ, স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক সহায়তা সেল, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উদ্ভাবনী উদ্যোগের ব্র্যান্ডিং এবং বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ সময়ের দাবি। আগামী পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আরও বড় পরিসরে দক্ষ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যও জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশলের অংশ হওয়া উচিত।

উল্লেখ্য, সরকারি চাকরির প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণের পেছনেও বাস্তব কারণ রয়েছে। চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং অন্যান্য সুবিধার কারণে অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ এমন চাকরির জন্য আবেদন করছেন বলে মনে করি।  একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের উন্নয়ন না হলে এই প্রবণতা সহজে কমবে না। সরকারি যেকোনো নিয়োগে পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন প্রয়োজন। চাকরিতে দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এখান থেকে  শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দেয়। চীন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা এবং শিল্পের মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। ভারতের জাতীয় শিক্ষা নীতি-২০২০ বহুমুখী দক্ষতা, ইন্টার্নশিপ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং শিল্প-অ্যাকাডেমিয়া সংযোগকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষা ধীরে ধীরে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশকেও একই পথে এগোতে হবে।

পাবনার ঘটনা তাই কোনো আকস্মিক সংবাদ নয়; এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। এই সংকটের সমাধান কেবল সরকারি চাকরির সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন উচ্চশিক্ষার গুণগত পরিবর্তন, দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম, শক্তিশালী শিল্প-অ্যাকাডেমিয়া সংযোগ, উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ এবং দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি। অন্যথায় পাবনার মতো ঘটনা বারবার ফিরে আসবে, আর উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রশ্নের মুখে পড়বে।

 

লেখক: ইমরান হোসেন, সিনিয়র সহকারী পরিচালক, জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
ইমরান হোসেন ই
ইমরান হোসেন

সিনিয়র সহকারী পরিচালক, জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

সম্পর্কিত খবর
Ad