বরিশালের সাতানি গ্রাম: ফিকে হচ্ছে পর্যটনের আশা

বরিশালের সাতানি গ্রাম: ফিকে হচ্ছে পর্যটনের আশা
ধ্বংসের মুখে সাতানি গ্রামের প্রাচীন স্থাপনা। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

উপেক্ষা আর উদাসীনতায় ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার সাতানি গ্রামের ঐতিহাসিক স্থাপনা। প্রায় সাড়ে চারশত বছর আগে নির্মিত সতীদাহ মঠ, জমিদার বাড়ি, একটি নার্সারি এবং একটি সরাইখানাসহ ২৪টি স্থাপনার মধ্যে ১৬টি ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। অনন্য নির্মাণশৈলীতে সমৃদ্ধ বাকি ভবনগুলো টিকে থাকার জন্য এখন জরুরি সংরক্ষণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

এখনো টিকে থাকা অল্প কয়েকটি স্থাপনার অন্যতম দত্তবাড়ি মৌজায় অবস্থিত দুটি জমিদার বাড়ি। বারো ভূঁইয়া রাজবংশের বংশধর সীতারাম ও বিজরাম ১৫৬০ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে এই বাড়ি দুটি নির্মাণ করেছিলেন। একসময়ের মুখরিত এই জমিদার বাড়ির উঠানগুলোতে এখন প্রতিদিনের পূজা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের বদলে কেবল মাঝেমধ্যে কিছু আচার-অনুষ্ঠান হয়। গবেষক, পর্যটক এবং ঐতিহ্যপ্রেমীরা নিয়মিত এখানে যাতায়াত করলেও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ খুবই কম। এমনকি তরুণ প্রজন্ম এই ধ্বংসাবশেষকে কেবলই পুরোনো স্মৃতি হিসেবে বিবেচনা করছে।

জমিদার বংশের সদস্য গোবিন্দ ভৌমিক ও শ্যামা প্রসাদ এই ক্ষয়ের বর্ণনা দিয়ে জানান, ভবনগুলোর ছাদ নেই, দেয়ালগুলো খসে পড়ছে। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের কোনো সম্পদ বা তহবিল তাদের কাছে নেই।

শ্যামা প্রসাদ বলেন, এই বাড়িটি ঈশ্বর নারায়ণ সরকারের ছিল। তিনি জানান, সুবর্ণ সময়ে এই বাড়িতে দুই শতাধিক মানুষ বসবাস করতেন। অথচ আজ সেখানে কেবল তারা দুজন টিকে আছেন।

ইতিহাসবিদ ও গবেষক সাইফুল আহসান বুলবুল এসব স্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘এই কাঠামো আমাদের এমন এক যুগের সাথে যুক্ত করে যখন বারো ভূঁইয়াসহ বাংলার শেষ স্বাধীন রাজ্যগুলো মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সময়েও তাদের নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখেছিল। এগুলো হারিয়ে ফেলা মানে আঞ্চলিক ও জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে মুছে ফেলা।’

আরও পড়ুন

সাতানি গ্রামে ‘ঐতিহ্য পর্যটন’ (হেরিটেজ ট্যুরিজম) ও শিক্ষার সম্ভাবনার ওপর জোর দিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদরা। বানারীপাড়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আফরোজা বেগম বলেন, এসব প্রাচীণ ভবন  সংরক্ষণ করা গেলে তা শিক্ষার্থী এবং দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করবে।

অন্যদিকে বাইসারী সৈয়দ বজলুল হক কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ এনামুল হক এই স্থানটিকে বাংলাদেশের একটি বিরল নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করে এটি রক্ষায় সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনস্থ বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান আরিফুর রহমান জানান, এই অঞ্চলে অন্য কোনো স্থানে এতগুলো প্রাচীন স্থাপনা একসাথে নেই। এই স্থানটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য শিগগিরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

বরিশাল বিভাগের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পুরো বিভাগে এ পর্যন্ত ২৫টি পুরাকীর্তি সংরক্ষণ করেছে। এর মধ্যে লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি, কদরাপুরের মিয়া বাড়ি মসজিদ এবং চাখারে শেরেবাংলার বিশ্রামাগার অন্যতম। তবে সাতানি গ্রাম ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এটি দীর্ঘদিন ধরে অনেকটাই উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, এই ভবনগুলোর জরুরি সংরক্ষণ কেবল বরিশালের স্থানীয় ইতিহাসকে রক্ষা করার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বাংলাদেশের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পটভূমির সাথে একে যুক্ত করার জন্যও অপরিহার্য। কারণ এটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত করবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad