বারকেন্দ্রিক অপরাধে বেপরোয়া ‘কিশোর গ্যাং’

বারকেন্দ্রিক অপরাধে বেপরোয়া ‘কিশোর গ্যাং’
Advertisement
Advertisement

রাজধানীর গুলশান, মিরপুর, উত্তরা, মোহাম্মদপুর ও ওয়ারীসহ বেশ কিছু এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। এসব এলাকায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় কিশোর গ্যাংয়ের উপদ্রব এখন চরমে। বিশেষ করে মদ বিক্রির বারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক অপরাধী চক্র। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সুযোগ নিয়ে নতুন কৌশলে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এসব এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও তথাকথিত ‘মব’ সৃষ্টি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেও কিশোর অপরাধীরা কিভাবে এত সক্রিয় এবং কাদের প্রশ্রয়ে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুলিশের তৎপরতা ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমেই কেবল এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, আইনের বিচারে বয়সের হিসাবকে কিশোর অপরাধীরা সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে ও এর অপব্যবহার করছে। এই সমস্যা দূর করা কেবল পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। সামাজিক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অভিভাবকদেরও সন্তানদের ওপর কড়া নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তৌহিদুল হক।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম জানান, কিশোর গ্যাং ধরতে শিগগিরই বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হবে। বিশেষ করে বার রয়েছে এমন এলাকাগুলোতে অপরাধ ঠেকাতে এরই মধ্যে নজরদারি ও অভিযান বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরা এলাকায় অন্তত ১০ থেকে ১২টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। আজমপুর, আব্দুল্লাহপুর, বড়বাগ, জসিম উদ্দিন রোড, ময়লার মোড় ও ১৪ নম্বর সেক্টর এলাকায় এদের দাপট সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকায় ‘বিগবস’, ‘পিকে গ্রুপ’, ‘চাপাতি সুমন গ্রুপ’, ‘ফার্স্ট হিটার বয়েজ’, ‘নাইন স্টার গ্রুপ’ ও ‘ডিসকো বয়েজ’ নামের গ্রুপগুলো স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে রেখেছে।

মিরপুর বিভাগে ৩২টি এবং পল্লবী থানায় ১৪টি কিশোর অপরাধী চক্র সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব গ্রুপগুলো সুমন, পিচ্চি বাবু, বিহারী রাসেল, বিচ্ছু বাহিনী, সাইফুল, সাব্বির, নয়ন, মোবারক, বাবলু ও রাজনসহ বিভিন্ন নামে পরিচালিত হচ্ছে। মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় ‘বাহুবলি গ্রুপ’ সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এছাড়া গুলশানে ১১টি এবং ওয়ারীতে ‘মোল্লা’ ও ‘সোনা’ নামের দুটি কিশোর গ্যাং সক্রিয়।

আরও পড়ুন

এসব কিশোর গ্যাং সন্ধ্যার পর থেকে ভোররাত পর্যন্ত বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা মূলত বারগুলোকে টার্গেট করে ছিনতাই ও চাঁদাবাজি পরিচালনা করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বারগুলোতে সংগীত পরিবেশন ও গভীর রাত পর্যন্ত অবস্থানের সুযোগে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণীদের যাতায়াত বাড়ায় অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে। অনেক সময় অপরাধীরা মোটরসাইকেলে মহড়া দিলেও পুলিশ নীরব থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা বারের ভেতরে নাচ-গান এবং মদ পান করে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। উঠতি বয়সের তরুণরা অতিরিক্ত মদ পান করে অসুস্থ হয়ে পড়ছে,  অনেক ক্ষেত্রে ভেজাল মদ বিক্রির অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।

বার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট এবং বার মালিক সমিতি অবশ্য ভিন্ন দাবি করেছে। তাদের মতে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই পুলিশ ও র‍্যাব অভিযানের নামে তাদের হয়রানি করছে।

তারা অভিযোগ করেন, অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়কে ‘মাদক’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। পুলিশি অভিযানের সুযোগ নিয়ে চাঁদাবাজি করছে স্থানীয় সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক ক্যাডাররা।

বার মালিক সমিতি আরও জানায়, চাঁদা না দিলে কিশোর গ্যাং ও রাজনৈতিক কর্মীরা বারগুলোর সামনে ‘মব’ বা বিক্ষোভ তৈরির হুমকি দিচ্ছে।

মিরপুর, গুলশান, উত্তরা ও ওয়ারীর বিভিন্ন বারে সাম্প্রতিক পুলিশি অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বার মালিকরা। সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একটি বিশেষ চক্র অভিযানের ভয় দেখিয়ে বড় অঙ্কের মাসোহারা বা অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। তল্লাশির নামে পুলিশ গ্রাহকদের ছবি প্রচার করে তাদের অধিকার খর্ব করছে বলেও তিনি দাবি করেন।

উত্তরার কয়েকজন বার মালিক জানান, কোনো বারে অভিযান চললেই কিছু লোক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যোগাযোগ করে টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে বার বন্ধ করার হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি তৌহিদী জনতা বা বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের নামে ধর্মীয় বয়ান তৈরি করেও সুযোগ সন্ধানী একটি চক্র ফায়দা লুটার চেষ্টা করছে বলে তারা জানান।

বার মালিকদের এসব অভিযোগের জবাবে ডিএমপির উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন এক বিবৃতিতে বলেন, কোনো স্থানে অপরাধের অভিযোগ, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কিংবা লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ হলে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, অভিযানের নামে চাঁদাবাজি বা হয়রানির সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেও কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
কামরুজ্জামান খান
কামরুজ্জামান খান

Staff Reporter, Times of Bangladesh

সম্পর্কিত খবর