গত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, বৈষম্য ও অন্যায়ের শিকার হওয়া ১৪১ জন সামরিক কর্মকর্তার মান-মর্যাদা ও পাওনা সুযোগ-সুবিধা ফিরিয়ে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
দীর্ঘদিনের বঞ্চনা নিরসনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে এসব কর্মকর্তার পদমর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে। এসব কর্মকর্তার একটি তালিকা সংগ্রহ করেছে ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’।
প্রতিকার পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ১১ জন মেজর জেনারেল বা সমমর্যাদার কর্মকর্তা, যার মধ্যে সেনাবাহিনীর ৯ জন মেজর জেনারেল, নৌবাহিনীর একজন রিয়ার অ্যাডমিরাল এবং বিমান বাহিনীর একজন এয়ার ভাইস মার্শাল। এছাড়া পদমর্যাদা বা পদোন্নতি ফিরে পাওয়া কর্মকর্তাদের তালিকায় ২৬ জন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বা সমমর্যাদার অফিসার রয়েছেন। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ২০ জন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, নৌবাহিনীর দুজন কমোডোর এবং বিমান বাহিনীর চারজন এয়ার কমোডোর।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এর ফলে তিন বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা এবং বকেয়া আর্থিক পাওনা ভূতাপেক্ষভাবে (পেছনের তারিখ থেকে) কার্যকর হবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি বিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই কমিটির ওপর ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে পদ্ধতিগত বৈষম্য ও পেশাগত ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত বা বরখাস্তকৃত কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনার দায়িত্ব ছিল।
ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের প্রাপ্য অধিকার
অবিলম্বে কার্যকর হওয়া এই তালিকায় সেনাবাহিনীর ১১০ জন, নৌবাহিনীর ১৯ জন এবং বিমান বাহিনীর ১২ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। এসব কর্মকর্তা সরকারি ঘোষণায় উল্লিখিত তারিখ অনুযায়ী ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও অবসরকালীন সুবিধা পাবেন। এছাড়া সরকার বিএমএ ৭৫তম লং কোর্সের চারজন কর্মকর্তা—লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফায়েত আহমেদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ ই এইচ এম ইকরামউজ্জামান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৌকির মাহমুদ তুষার এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ ওমর নাসিফকে তাদের জ্যেষ্ঠতা ও আর্থিক সুবিধাসহ অবিলম্বে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছে।
মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তারা তাদের প্রাপ্য পদমর্যাদা অনুযায়ী রেকর্ড সংশোধন এবং বিধি মোতাবেক বকেয়া বেতন-ভাতা পাবেন।
আবাসন সুবিধা
পদমর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের আবাসন সংকটের মতো বাস্তব সমস্যাগুলোও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যারা বরখাস্ত বা বাধ্যতামূলক অবসরের কারণে আবাসন প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, তারা এখন ডিওএইচএস এবং জলসিঁড়ি প্রকল্পে প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন।
কমিটি বিশেষ করে ছয়জন কর্মকর্তা এবং একজন প্রয়াত কর্মকর্তার পরিবারের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা বিবেচনা করে তাঁদের অবিলম্বে ফ্ল্যাট বা প্লট দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এই তালিকায় রয়েছেন প্রয়াত মেজর জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আলী জায়ীদ, মেজর হেলাল মোহাম্মদ খান, ক্যাপ্টেন মো. রেজাউল করিম, ক্যাপ্টেন খন্দকার রাজীব হোসেন, ক্যাপ্টেন মো. ফুয়াদ খাঁন শিশির এবং ক্যাপ্টেন মো. খাঁন সুবায়েল বিন রফিক।
প্রতিরক্ষা সচিব মোঃ আশরাফ উদ্দিন তিন বাহিনীর প্রধানদের এই আদেশ অবিলম্বে বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। এর আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসা সুবিধা প্রদান এবং তাদের নামের পাশে থাকা ‘কালো তালিকা’ বা ‘পর্যবেক্ষণ’ অবস্থা প্রত্যাহারের নির্দেশনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পেশাগত সততা রক্ষায় নীতিগত পরিবর্তন
কমিটির এই সুপারিশগুলো সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার লক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার অবিলম্বে ‘রাজনৈতিক ট্যাগিং’ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার সরাসরি প্রমাণ ছাড়া আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে কোনো কর্মকর্তার ওপর রাজনৈতিক তকমা লাগানো যাবে না।
এছাড়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদি ডিজিএফআই বা বাহিনীর নিজস্ব গোয়েন্দা শাখা কোনো কর্মকর্তার ক্যারিয়ার সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে তা জানাতে হবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অগোচরে কোনো গোপন ফাইল না রাখার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সরকার জোর দিয়ে বলেছে যে, সামরিক বাহিনীর রাজনীতিতে জড়ানো অবৈধ এবং ভবিষ্যতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সম্পূর্ণ পেশাদার যোগ্যতার ভিত্তিতে সম্পন্ন করতে হবে।


