সংবিধান সংশোধনের সমপর্যায়ের কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, “সংবিধান সংশোধনের সমতুল্য কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে কার্যকর করা হলে তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। এ কারণে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অধ্যাদেশের পরিবর্তে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ করা হয়েছে। তবে এই আদেশের আইনগত মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”
সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তার বক্তব্যের এ অংশের সঙ্গে একই দিনের প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর তথ্যও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭২ সালে সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আর নেই। সংবিধান কার্যকর হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতির আদেশে যেসব আইন করা হয়েছিল, সেগুলোর আইনগত মর্যাদা ছিল। কিন্তু সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। সংসদ না থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, বিএনপি স্পষ্টভাবেই জানিয়েছে যে তারা জুলাই সনদের পথেই এগোতে চায়।
সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে ভিত্তি হিসেবে রাখার কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার বা সংশোধনের যেকোনো উদ্যোগকে ‘বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি’র পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
কেশবানন্দ ভারতী মামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭২ সালে এই তত্ত্বের সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। বাংলাদেশের সংবিধান-সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার রায়েও, বিশেষ করে অষ্টম সংশোধনীর মামলায়, এই তত্ত্ব গ্রহণ করা হয়েছে।’
আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদে ৩৩টি রাজনৈতিক দল সই করেছে। সনদের সংশ্লিষ্ট অংশে সংস্কারের বিষয়গুলো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। ফলে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে বাদ দিয়ে নয়, সেটিকে সামনে রেখেই সংস্কারের পথে যেতে হবে।
‘৭২-এর সংবিধান ছুড়ে ফেলে’ নতুন সংবিধান লেখার যে আলোচনা রয়েছে, সেটি ভিন্ন বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই সনদে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষের কথা বলা হয়েছে। জনগণের পাওয়া ভোটের অনুপাত অনুযায়ী উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে। তবে কোনো রাজনৈতিক দল এতে আপত্তি জানিয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে বিকল্প প্রস্তাব দিলে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর সেটিকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিএনপি উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনে আনুপাতিক বা ‘প্রোরাটা’ পদ্ধতির কথা বলেছে। দলটি এ বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে এবং নির্বাচনী ইশতেহারেও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে।
মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইন নিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইন দুটি অধ্যাদেশ আকারে করা হয়েছিল। পরে সংসদে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে আবার এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইনে বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, ব্যাপক ও পদ্ধতিগত গুমের ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যাবে। আর এর বাইরে পৃথক গুমের ঘটনা সাধারণ ফৌজদারি আদালতে বিচার হবে।
মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখার কথাও জানান তিনি। তবে কমিশনকে অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী।
আইনকে পরিবর্তনযোগ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো আইনই চিরস্থায়ী নয়। বাস্তবে প্রয়োগ করতে গিয়ে সমস্যা দেখা দিলে সংশোধনের সুযোগ থাকতে হবে। একই সঙ্গে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি জবাবদিহির নামে ভুক্তভোগী না হন।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে জারি করা অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার এটি কার্যকর করবে না—এমন কথা বলেনি। বরং বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী জজকে সরাসরি বদলি করার ক্ষমতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় শুধু বদলির প্রস্তাব দিতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের।
বিচারকদের শোকজ করা নিয়েও ব্যাখ্যা দেন তিনি। কয়েকজন বিচারক কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনে যুক্ত হওয়া এবং কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আচরণবিধির পরিপন্থী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে শোকজ পেয়েছিলেন বলে জানান আইনমন্ত্রী। পরে তাদের জবাব পাওয়ার পর বিষয়গুলো সুপ্রিম কোর্টে পাঠানোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না হলে তাদের কর্মসূচি পালনের অধিকার রয়েছে। সরকারের সমালোচনা করাও রাজনৈতিক দলের সাংবিধানিক অধিকার। সরকারের দায়িত্ব হলো সেই অধিকার নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, সমালোচনা সরকারকে ভুল থেকে দূরে রাখতে সহায়তা করে। তবে সমালোচনার ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, তারা গুম, খুন, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার পুরোনো সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে চান না।
তিনি দাবি করেন, আগের সময়ের তুলনায় রাজনৈতিক মামলা ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। গুমের অভিযোগের তদন্ত চলছে বলেও জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, তাদের কিছু দুর্বলতা আছে এবং তা তারা অস্বীকার করছেন না। তবে বাস্তবতা মেনে নিয়ে সংস্কারের পথে সামনে এগোতে চান। তার ভাষায়, প্রথম দিন থেকেই সরকার সব ক্ষেত্রে নেতিবাচক পথে যাচ্ছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।


