শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায়কে ‘উদ্বেগজনক’ বলেছে মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। তাদের দাবি, এ রায় আন্তর্জাতিক মানের ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণ করেনি।
এইচআরডব্লিউ-এর এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘হাসিনার দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ এখনো প্রবল। কিন্তু যেকোনো বিচারকাজে আন্তর্জাতিক মানের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই হবে। এর ব্যত্যয় ঘটার সুযোগ নেই।’
তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনাও ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। এসব অপরাধের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তবে তা হতে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারের মাধ্যমে।
সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় তারা দুজনই অনুপস্থিত ছিলেন এবং নিজেদের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না থাকায় এই বিচারিক রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মানবাধিকার নিশ্চিতের মানদণ্ডের স্পষ্ট লঙ্ঘন যা রায়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
মামলার তৃতীয় আসামি ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন পুলিশের হেফাজতে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করতে প্রাণঘাতী অস্ত্র, ড্রোন, হেলিকপ্টার ব্যবহারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা ও তার সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এমনকি নিরাপত্তাবাহিনীর মানবতাবিরোধী তিনটি আলাদা ঘটনায় আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঠেকাতেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি বলেও অভিযোগ করা হয়।
মামলায় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, ভুক্তভোগী ও নিহতদের পরিবারসহ মোট ৫৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে শেখ হাসিনার অডিও রেকর্ড ডিজিটাল আলামত হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
রাষ্ট্রনিযুক্ত একজন আইনজীবী হাসিনা ও কামালের পক্ষে ছিলেন তবে তিনি অভিযুক্তদের কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি। তিনি সাক্ষীদের জেরা করলেও নিজেদের পক্ষ থেকে কোনো সাক্ষী উপস্থাপন করেননি।
এইচআরডব্লিউ মনে করে, অভিযুক্তদের অনুপস্থিতিতে বিচার ন্যায়বিচারের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদেও অভিযুক্তের সরাসরি উপস্থিতির অধিকার স্পষ্টভাবে স্বীকৃত।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘হাসিনা সরকারের সময় যেসব মানুষ ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তারা অবশ্যই ন্যায়বিচার পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে অভিযুক্তদের অধিকারও সুরক্ষিত রাখতে হবে। মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করাও জরুরি, কারণ এটি নির্মম এবং অপরিবর্তনীয় শাস্তি।’
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটির মতে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ‘যেকোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তকে সরাসরি আদালতে উপস্থিত হওয়ার, আইনজীবীর সহায়তা নেবার, তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ দিতে হবে।’


