নড়াইলের দিগন্তজোড়া মাঠে এখন ধান কাটার মহোৎসব। কৃষকের আঙিনায় চলছে মাড়াই, ঝাড়াই আর ধান শুকানোর ব্যস্ততা। সোনালি ধান গোলায় তোলার এই চিরচেনা দৃশ্যে এখন এক বড় অভাব–বাঁশের তৈরি সেই ঐতিহ্যবাহী ‘ডোল’। যুগের পরিক্রমায় এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ এই ধানের ডোল এখন বিলুপ্তির পথে।
একসময় গ্রামাঞ্চলে প্রতিটি গৃহস্থের বাড়িতে ধানের ডোল ছিল আভিজাত্য ও সচ্ছলতার প্রতীক। উঁচু বাঁশ বা কাঠের মাচার ওপর বসানো গোল আকৃতির এই বিশাল আধারগুলো ছিল ধান সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম। নিপুণ হাতে বাঁশ চিরে কারিগররা তৈরি করতেন এই ডোল। কিন্তু আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে এটি কেবলই ইতিহাস, আর প্রবীণদের কাছে এক মধুর স্মৃতি।
নলদী ইউনিয়নের ষাটোর্ধ্ব ওহাব কাজী আক্ষেপ করে বলেন, ‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন ধান সংরক্ষণের ধরন বদলে গেছে। কৃষকরা এখন আগের মতো দীর্ঘ সময় ধান মজুত রাখতে পারেন না। ফলে এক সময়ের অতিপ্রয়োজনীয় এই ধানের গোলা এখন সচরাচর চোখেই পড়ে না।’
একই এলাকার কৃষক পাখী শেখের মতে, ধান রাখার জন্য ডোলই ছিল সবচেয়ে নিরাপদ ও টেকসই। কিন্তু বর্তমানে বাজারে টিন বা প্লাস্টিকের ড্রাম এবং পাটের বস্তা সহজে পাওয়া যাওয়ায় মানুষ সেদিকেই ঝুঁকছে। তৈরির ঝামেলা না থাকা এবং প্লাস্টিকের সহজলভ্যতাই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ।
ডোলের ব্যবহার কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বাঁশশিল্পীরা। স্থানীয় কারিগররা জানান, আগে পাড়ায় পাড়ায় ডোল তৈরির ধুম ছিল। এখন কাজ নেই বললেই চলে, ফলে পৈতৃক পেশা ছেড়ে অনেকে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, ডোল ছিল সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। প্লাস্টিকের ড্রাম টেকসই হলেও তা পরিবেশের জন্য সহায়ক নয়। পাড়া-মহল্লায় বাঁশঝাড় কমে যাওয়াও এই শিল্প বিলুপ্তির অন্যতম একটি কারণ।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বাঁশের ডোল কেবল একটি পাত্র ছিল না, এটি ছিল আমাদের লোকজ সংস্কৃতির এক অনন্য অংশ। গ্রামীণ এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে ডোল কেবল ছবির পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে। নতুন প্রজন্মকে আমাদের শেকড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এই লোকজ উপকরণগুলো সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।


