আকস্মিক বন্যা এবং জলাবদ্ধতার কারণে বারবার ফসল হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা। এই সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় অভাব ও কষ্টের চক্রে আটকা পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও গবেষকদের মতে, এই ক্ষয়ক্ষতির জন্য কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ দায়ী নয়। এর পেছনে কর্তৃপক্ষের অবহেলা, ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা এবং দুর্নীতির বড় ভূমিকা রয়েছে।
গত এক দশকে হাওর অঞ্চলে বেশ কয়েকবার বড় ধরনের ফসলহানি ঘটেছে। চলতি বছর সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এবং নেত্রকোণার বিস্তীর্ণ এলাকার অন্তত ৪৭ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোনো বছর পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় ফসলহানি হয়। তবে এবার এপ্রিলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ফলে ফসল কাটার আগেই ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
হাওর অঞ্চলে দুই কোটিরও বেশি মানুষের বাস, যাদের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। কৃষকদের কাছে আগাম আবহাওয়ার বার্তা পৌঁছাতে ব্যর্থতা, অপরিকল্পিত নির্মাণ প্রকল্প এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে এই সংকটের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশ্মীর রেজা এই সংকটের মূলে নদীর নাব্যতা হ্রাসকে দায়ী করেছেন।
কাশ্মীর রেজা জানান, নদীগুলোর গভীরতা কমে যাওয়াই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। তিনি অভিযোগ করেন, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ এবং এসব প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একইভাবে হাওর গবেষক শফিকুল ইসলাম বলেন, স্বার্থান্বেষী মহলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নদীগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
শফিকুল ইসলাম হাওরের বর্তমান অবস্থার জন্য সাতটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো—উজানে বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণ, মাছ ধরার জন্য নদীতে কৃত্রিম বাধা তৈরি, নদী দখল করে অবৈধ ঘরবাড়ি ও বাজার স্থাপন, অপরিকল্পিত ডুবন্ত বাঁধ, অতিরিক্ত পলি জমা, ড্রেজিং বা খনন কাজের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তন।
অপরিকল্পিত বাঁধ নিয়ে প্রশ্ন
হাওর অঞ্চলে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের আগে বাঁধ মেরামত বা নতুন বাঁধ নির্মাণ করা হয়। সুনামগঞ্জের কৃষক সংগঠনের নেতারা এবারের জলাবদ্ধতা ও ফসলহানির জন্য অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় জানান, এ বছর নির্মিত বাঁধগুলোর মধ্যে ৮০ থেকে ৯০টি বাঁধেরই কোনো প্রয়োজন ছিল না।
তিনি বলেন, এসব অপ্রয়োজনীয় বাঁধের কারণেই হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বাঁধ প্রকল্পে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও উদ্বোধনের পর আর কোনো তদারকি থাকে না। পরবর্তী সময়ে বাঁধের কাজ কেমন হলো বা এর কার্যকারিতা কী, তা কেউ পর্যবেক্ষণ করে না।
বিজন সেন বলেন, ফসল নষ্ট হলেই সাধারণত অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতকে দায়ী করা হয়। কিন্তু এবার ক্ষতি হয়েছে মূলত জলাবদ্ধতার কারণে, যার প্রধান কারণ ছিল যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণ।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. ওবায়দুল হক মিলন অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ প্রকল্পগুলোকে দুর্নীতির উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে।
তার মতে, চলতি বছর তিন শতাধিক বাঁধে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। মিলন জানান, ২০১৮ সাল থেকে বাঁধের কাজে যে মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কালক্রমে খাল, নদী এবং হাওরের ভেতরে গিয়ে পড়ছে। এর ফলে হাওরের পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে এবং ভারী বৃষ্টি হলেই দ্রুত প্লাবিত হচ্ছে।
নেত্রকোণার কৃষকরাও ফসলহানির জন্য অপরিকল্পিত বাঁধ এবং স্লুইস গেট দিয়ে পানি নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন। কলমাকান্দার মেদা বিল, মদনের গণেশের হাওর এবং খালিয়াজুরীর টোলার হাওরসহ হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান এখন পানির নিচে।
তবে বাঁধের ত্রুটির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নেত্রকোণা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন। তার দাবি, হঠাৎ ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে আসা পানির ঢলে নদী উপচে হাওরে প্রবেশ করেছে।
সাখাওয়াত হোসেন জানান, কলমাকান্দায় একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়া ছাড়া অন্য কোথাও বাঁধের ত্রুটির কারণে ফসলহানি হয়নি।
কৃষকদের কাছে পৌঁছায় না আগাম সতর্কবার্তা
দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বছরে দুই বা তিনবার ফসল ফলানো সম্ভব হলেও হাওর অঞ্চলের মানুষ বছরে কেবল একটি বোরো ফসলের ওপর নির্ভর করেন। দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ আসে এই হাওর এলাকা থেকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণায় দেশের মোট বোরো আবাদের প্রায় এক শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, ধানের ৮০ শতাংশ পাকলে তা ২৮ এপ্রিলের মধ্যে কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে এই সতর্কবার্তা তৃণমূলের কৃষকদের কাছে কতটুকু পৌঁছেছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার শিমুলবাঁক গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল হক নয়ন জানান, তারা সরকারি সংস্থাগুলো থেকে কোনো আগাম আবহাওয়ার তথ্য বা নির্দেশনা পান না।
নয়ন আক্ষেপ করে বলেন, বছরের কোনো সময় কেমন আবহাওয়া থাকবে বা কোন ফসলের ফলন ভালো হবে সে সম্পর্কে তাদের কেউ ধারণা দেয় না। ফসল কখন কাটা নিরাপদ হবে সেই বিষয়েও তারা সঠিক সময়ে কোনো দিকনির্দেশনা পান না।
হাওর গবেষক রওশন আলী রুশো জানান, হাওর অঞ্চলের দীর্ঘদিনের চেনা আবহাওয়ার ধরণ এখন বদলে গেছে। তার মতে, অতীতে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু যেভাবে নিয়মিত প্রবাহিত হতো, এখন আর তা দেখা যায় না। আবহাওয়ার এই পরিবর্তন কৃষকদের জন্য চাষাবাদকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সমাধানের পথ কী?
গবেষক ও পরিবেশবাদীদের মতে, হাওর অঞ্চলের দুর্যোগ কমাতে নদী ও জলাশয়ের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে জরুরি। গবেষক রওশন আলী রুশো বলেন, নদী খনন, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরে আসবে। তিনি মনে করেন, মানুষ প্রকৃতির যত্ন নিলে প্রকৃতিও মানুষকে সুরক্ষা দেবে।
নদী খননের পাশাপাশি হাওরের সাথে সংযুক্ত খাল ও বিলগুলো খনন করার ওপর গুরুত্ব দেন কাশ্মীর রেজা। তিনি বলেন, পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে স্লুইস গেটগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সময় হাওরের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রাখার জন্য তিনি নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান।
কাশ্মীর রেজা সতর্ক করে বলেন, হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশকে গুরুত্ব না দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা করলে কখনোই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। সংকটের স্থায়ী সমাধানে দুর্নীতিমুক্ত পানি ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নদী শাসনের বিকল্প নেই।


