যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার আবিদা ইসলামকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের একটি মন্তব্য নিয়ে তোলপাড় চলছে। এই ঘটনা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনসমক্ষে কেমন আচরণ করা উচিত, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলার সময় উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির হাইকমিশনারের সমালোচনা করেন। তিনি আবিদা ইসলামকে লন্ডন থেকে প্রত্যাহারের খবরকে ‘সুসংবাদ’ বলে উল্লেখ করেন। উপদেষ্টার অভিযোগ, হাইকমিশনার বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেননি। তিনি লন্ডনের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিয়ে কাজ করেছেন বলেও উপদেষ্টা দাবি করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের উপস্থিতিতেই উপদেষ্টা এমন মন্তব্য করেন। তবে উপদেষ্টার এসব কথার কোনো প্রতিবাদ করেননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অনেকে মনে করছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই নীরবতা আসলে উপদেষ্টার কথার প্রতি সমর্থন। তবে সরকার থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি। এই ঘটনায় সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকরা বেশ অবাক হয়েছেন। তাদের মতে, একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন প্রকাশ্য মন্তব্য করা শিষ্টাচারবিরোধী।
কূটনৈতিক মহলে সমালোচনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি একটি সাধারণ নিয়ম। কিন্তু জনসমক্ষে কোনো কূটনীতিককে এভাবে হেয় করা ঠিক নয়। এটি দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক রীতিনীতির পরিপন্থী। বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে বলেন, উপদেষ্টা পদমর্যাদার ব্যক্তিদের আরও বুঝেশুনে কথা বলা উচিত।
কূটনীতিকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিদেশের মাটিতে সিনিয়র কর্মকর্তাদের এভাবে সমালোচনা করলে কূটনীতিকদের কাজের উৎসাহ কমে যায়। এতে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সার্ভিস নিয়ে ভুল বার্তা যেতে পারে। সাবেক কূটনীতিকদের মতে, কোনো কর্মকর্তার কাজে ভুল থাকলে তা দাপ্তরিকভাবে সমাধান করা উচিত।
কে এই আবিদা ইসলাম
আবিদা ইসলাম একজন পেশাদার কূটনীতিক। তিনি ১৯৯৫ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি দেশের হয়ে কাজ করছেন। এর আগে তিনি দক্ষিণ কোরিয়া ও মেক্সিকোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। এ ছাড়া কলকাতায় উপ-হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। গত বছরের জানুয়ারি থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে কাজ করছেন।
সহকর্মীরা তাকে একজন দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে চেনেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, লন্ডনের মতো জায়গায় সব পক্ষকে খুশি রাখা খুব কঠিন। হাইকমিশনারের সমর্থকরা মনে করেন, কোনো নির্দিষ্ট দলের কথায় সায় না দিয়ে নিরপেক্ষ থাকতে গিয়েই তিনি সরকারি দলের বিরাগভাজন হয়েছেন। তবে এ ধরনের সমস্যা আলোচনার মাধ্যমেই মেটানো উচিত ছিল।
জনসমক্ষে আচরণের দায়বদ্ধতা
উপদেষ্টার এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন কূটনীতিক কোনো নির্দিষ্ট দলের নন, তিনি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। তাই তাকে আক্রমণ করার অর্থ হলো রাষ্ট্রকেই ছোট করা। বিদেশের মাটিতে এ ধরনের মন্তব্য আরও বেশি সংবেদনশীল। এর ফলে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে অন্যদের কাছে খারাপ ধারণা যেতে পারে।
কর্মকর্তাদের মনোবলে প্রভাব
এই ঘটনায় বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের ভয় ও হতাশা তৈরি হয়েছে। সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের মতে, রাজনৈতিক নেতাদের এমন মন্তব্য কর্মকর্তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। তারা মনে করেন, এমন পরিবেশ থাকলে মেধাবীরা সরকারি চাকরিতে আসতে চাইবে না। বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য বরাবরই পেশাদারত্বের ওপর টিকে ছিল, এই সংস্কৃতি ধরে রাখা খুব জরুরি।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি
গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশে একটি নতুন সরকার গঠন হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ মানুষ আশা করেছিল প্রশাসনে বড় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোতে একের পর এক রদবদল নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রশাসনের কাজের ধরন সম্পর্কে যাদের ধারণা কম, তাদের এমন বক্তব্য সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের পরীক্ষা
পুরো ঘটনাটি আসলে সরকার ও প্রশাসনের মধ্যকার সম্পর্কের একটি পরীক্ষা। নির্বাচিত সরকার নীতি ঠিক করে, আর কর্মকর্তারা তা বাস্তবায়ন করেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও পেশাদার স্বাধীনতার মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য থাকাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কূটনৈতিক মহল আশা করে, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সরকারি কর্মকর্তাদের মর্যাদা রক্ষা করা হবে।


