দেশজুড়ে ভূমিকম্পের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ আবাসিক হলে ফাটল ধরা এবং একাধিক শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পর, অবশেষে জরুরি ভিত্তিতে হল সংস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা আলোচনা ও সমালোচনার পর, টানা দুই দিনের ভূমিকম্পে ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হওয়ায় এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
শনিবার রাত নয়টায় জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রবিবার থেকে ১৪ দিনের জন্য সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আবাসিক শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রোববার বুয়েটের শিক্ষক ইশতিয়াক আহমদের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল হাজী মুহম্মদ হল এবং বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল পরিদর্শন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ভূমিকম্পে আমাদের কিছু শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। অনেকে হলে ফিরতে পারছেন না। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রতিটি কক্ষ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা জরুরি। যার কারণে জরুরি সিন্ডিকেট মিটিং ডেকে ক্লাস পরীক্ষা বাতিলসহ আবাসিক শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
শুক্রবার ও শনিবারের ভূমিকম্পে অন্যদের পাশাপাশি একটু বেশি আতঙ্কে ছিলেন পূর্বেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত পুরাতন হলগুলোর শিক্ষার্থীরা।
অন্তত ১০টি হলে ফাটলের বিষয় হল সংসদের নেতারা নিশ্চিত করেছেন, তবে অন্যান্য হলের ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
শুক্রবার দুপুর ১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত শুধুমাত্র শহীদ বুদ্ধিজীবী মোহাম্মদ মুর্তজা মেডিক্যাল সেন্টারে ভূমিকম্পের আতঙ্কে ছাদ থেকে লাফ দেওয়া বা পা মুচকে অন্তত ১৫ শিক্ষার্থী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়া, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন আরও অনেকেই। ঠিক তার পরের দিনের ভূমিকম্পের ঘটনায় শামসুন্নাহার হলের তিন নারীসহ আহত হয়েছেন মোট ছয় শিক্ষার্থী। যাদের মধ্যে একজনের পা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় হল সংসদের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মিনহাজ।
দীর্ঘদিন ধরে, হলগুলোর দেয়াল ও ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়া, রড বেরিয়ে আসা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনেক সময় কেবল রং বা সামান্য সিমেন্ট দিয়ে ক্ষতস্থান ঢেকে দেওয়া হলেও স্থায়ী কোনো সংস্কার কাজ করা হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। তাদের মতে, পূর্বেই ঝুঁকিপূর্ণ হলগুলোর সংস্কার শুরু হলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো। ভূমিকম্পের পর থেকে বিষয়টি নিয়ে ঢাবি শিক্ষার্থীদের একটি প্রাইভেট ফেসবুক গ্রুপে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
ঢাবির অন্তত নয়টি হলে ঘুরে দেখা যায়, ভবনগুলোর বারান্দা ও কক্ষের বিভিন্ন স্থানে ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে। কোথাও কোথাও রডও বেরিয়ে রয়েছে। এমনকি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় মাঝ বরাবর বড়ো ধরনের ফাটলও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
ঢাবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ আক্রাম হোসেন টাইমসকে বলেন, হল মেরামতের জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হলেও সরকার থেকে বাজেট অনুমোদন না মেলায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তবে শনিবার রাতের জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলসহ সব ঝুঁকিপূর্ণ হল দ্রুত বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে পরিদর্শন করা হবে। পরিদর্শন দলে থাকবেন হল প্রাধ্যক্ষ, আবাসিক শিক্ষক, ডাকসু ও হল সংসদের প্রতিনিধিরা। কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আগে থেকেই আবাসিক হলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ‘স্বাধীনতা ভবন’ এ সিট বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছেন কয়েকটি হলের শিক্ষার্থী। তবে শুক্রবার ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর মহসিন হলের শিক্ষার্থীরা ভবনটির কয়েকটি কক্ষের তালা ভেঙে সেখানে ওঠে। কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগেই শনিবার রাতে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের একদল শিক্ষার্থী ভবনে সিট বরাদ্দের দাবিতে নিচে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে।
কুয়েত মৈত্রী হলের প্রাধ্যক্ষ টাইমসকে বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছি এবং সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’
ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্তের পর সকাল থেকেই বেশ কিছু আবাসিক হলের শিক্ষার্থী হল ত্যাগ করতে শুরু করেন। তবে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে হলে অবস্থান করছেন।
এ ছাড়া নিরাপদ আবাসনসহ তিন দফা দাবিতে ঢাবি উপাচার্যের বাসভবনের সামনে কাঁথা-বালিশ নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন একদল শিক্ষার্থী। কর্মসূচি চলাকালে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে (ডাকসু) ‘দ্বিচারিতাকারী’ হিসেবে অভিহিত করে হেদায়েত প্রার্থনায় মোনাজাত করেন।
তবে রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে বিকাল ৫টার মধ্যে হল ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বৈঠকে সব হলের ক্যান্টিন ও ডাইনিং বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের কক্ষ ত্যাগের পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে কক্ষের চাবি জমা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


