কক্সবাজার বেড়ানোর নতুন জায়গা

কক্সবাজার বেড়ানোর নতুন জায়গা
Advertisement
Advertisement

প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে কক্সবাজার মানেই সমুদ্রের বিশালতা, তবে এই সৈকত শহরের আড়ালে লুকিয়ে আছে পাহাড়ী অরণ্য, প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আর সীমান্তের শেষ জনপদের গল্প। যারা গতানুগতিক সুগন্ধা বা কলাতলী সৈকতের ভিড় এড়িয়ে একটু ভিন্ন স্বাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, তাদের জন্য কক্সবাজারের স্বল্পপরিচিত এই স্থানগুলো হতে পারে এক অনন্য আবিষ্কার। পাহাড়ের চূড়া থেকে শুরু করে নাফ নদীর মোহনা পর্যন্ত বিস্তৃত এই গন্তব্যগুলো পর্যটকদের ভ্রমণতালিকায় যোগ করে নতুন মাত্রা।

পাহাড়ের হাতছানি: ‘মিনি বান্দরবান’

কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে মেরিন ড্রাইভ থেকে প্রবেশ করে রামু উপজেলার পাহাড়ি এলাকাটি বর্তমানে পর্যটকদের কাছে ‘মিনি বান্দরবান’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। বান্দরবানের মতোই উঁচু-নিচু পাহাড়ী রাস্তা আর ঘন সবুজের সমারোহ এখানে মুগ্ধতা ছড়ায়। কক্সবাজার শহর থেকে ইজিবাইক বা সিএনজি রিজার্ভ করে সরাসরি এই এলাকায় যাওয়া যায়। এখানে ভ্রমণের সময় পাহাড়ী ঢাল আর আঁকাবাঁকা রাস্তার সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি রামুর প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির বা কেয়াংগুলো দেখে নেওয়া যায়। রামুর উত্তর মিঠাছড়িতে ১০০ ফুট লম্বা সিংহশয্যা বুদ্ধ মূর্তিটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ, যা পাহাড়ের ওপর বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।

ইতিহাসের সাক্ষী: ক্যাপ্টেন কক্সের বাংলো

কক্সবাজার শহরের নামকরণের পেছনে যার ভূমিকা রয়েছে, সেই ব্রিটিশ অফিসার ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের স্মৃতিবিজড়িত ‘ক্যাপ্টেন কক্সের বাড়ি’ ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। রামু উপজেলায় এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি অবস্থিত। ইতিহাসের সন্ধানী পর্যটকরা একবার হলেও এখানে ঢুঁ মারেন।

সীমান্তের শেষ সীমানা: শাহ পরীর দ্বীপ

কক্সবাজারের সবচেয়ে দক্ষিণ প্রান্তে এবং টেকনাফ উপজেলার শেষ সীমানায় অবস্থিত শাহ পরীর দ্বীপ। নাফ নদী আর বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত এই জনপদটি তার আদিম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। টেকনাফ শহর থেকে সাবরাং হয়ে শাহ পরীর দ্বীপে যাওয়ার পথটি অত্যন্ত চমৎকার। একপাশে সমুদ্রের নীল পানি আর অন্যপাশে নাফ নদীর ওপাড়ে মিয়ানমারের পাহাড়ী সীমানা—এই দৃশ্য পর্যটকদের রোমাঞ্চিত করে। যাতায়াত ব্যবস্থা এখন অনেক উন্নত হওয়ায় পর্যটকরা দিনে দিনেই টেকনাফ ও শাহ পরীর দ্বীপ ঘুরে আবার কক্সবাজার শহরে ফিরে আসতে পারেন।

আরও পড়ুন

এই জায়গাগুলো ভ্রমণের জন্য কক্সবাজার শহরকে মূল কেন্দ্র হিসেবে রাখাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। খাওয়া-দাওয়ার জন্য শহরের রেস্তোরাঁগুলোতে ঢু মারতে পারেন।

ভ্রমণ পরিকল্পনা:

কক্সবাজারের পরিচিত সৈকতগুলোর পাশাপাশি এই স্বল্পপরিচিত এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলো সহজে ঘুরে দেখার জন্য ৩ দিন ২ রাতের একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রথম দিন: ইতিহাস ও বৌদ্ধ মন্দির দর্শন

ভ্রমণের প্রথম দিনটি উৎসর্গ করা যেতে পারে কক্সবাজার শহরের ভেতরের দর্শনীয় স্থানগুলোর জন্য। সকালে নাস্তা শেষ করে রিকশা বা টমটমে করে অগ্গমেধা ক্যাং ও মৈত্রী বিহার ঘুরে দেখুন। এর চলে যেতে পারেন শহরের কাছেই রামুতে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের স্মৃতিবিজড়িত বাংলো দেখতে। এই ক্যাপ্টেন কক্সের নামেই অতীতের পালংকী এলাকার নাম হয়েছে কক্সবাজার। এরপর শহরে ফিরে কোনো জনপ্রিয় রেস্তোরাঁয় সেরে নিয়ে বিকেলে চলে যেতে পারেন সুগন্ধা কিংবা লাবনী বিচে। সাগর পাড়ে সূর্যাস্ত দেখে সন্ধ্যাটি বার্মিজ মার্কেটে কেনাকাটা করে কাটাতে পারেন।

দ্বিতীয় দিন: মিনি বান্দরবান ও রামুর বৌদ্ধ ঐতিহ্য

দ্বিতীয় দিনে একটু সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন রামু ও ‘মিনি বান্দরবান’ খ্যাত পাহাড়ী এলাকার উদ্দেশ্যে। শহর থেকে একটি সিএনজি বা অটো রিজার্ভ করে পাহাড় আর আঁকাবাঁকা রাস্তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে চলে যান রিজু খালের কাছেই মিনি বান্দরবান। সেখানে ছোট ছোট পাহাড়ে কিছুটা সময কাটিয়ে চলে যাবেন ১০০ ফুট সিংহশয্যা বুদ্ধ মূর্তি দেখতে। সেখান থেকে রামু সীমা বিহার ও অন্যান্য প্রাচীন কেয়াংগুলো ঘুরে দেখুন। এরপর বিকেলের মধ্যে আবার কক্সবাজার শহরে ফিরে আসতে পারবেন। ফেরার পথে হিমছড়ি পাহাড়ের চূড়া থেকে গোধূলির আকাশ দেখে নিতে পারেন।

ছবি: মাসুম-আল-হাসান রকি

তৃতীয় দিন: সীমান্তের শেষ জনপদ শাহ পরীর দ্বীপ

শেষ দিনটি রাখুন একটু রোমাঞ্চকর অভিযানের জন্য। খুব ভোরে কক্সবাজার শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক হয়ে টেকনাফের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করুন। জিপ বা চাঁদের গাড়ি কিংবা সিএনজি চালিত অটোরিকশা রিজার্ভ করলে পুরো পথের সৌন্দর্য চমৎকারভাবে উপভোগ করা যাবে। টেকনাফ পৌঁছে থানার ভেতরে মাথিনের কূপ ঘুরে দেখুন। এরপর সেখান থেকে নাফ নদী আর সাগরের মোহনায় অবস্থিত শাহ পরীর দ্বীপে চলে যান। সীমান্তের ওপাড়ে মিয়ানমারের পাহাড় আর এপাড়ে নীল জলরাশির মিতালি দেখে বিকেলের মধ্যে টেকনাফ থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিন।

প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য ও সতর্কতা

এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘোরার জন্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে গাড়ি আগেভাগেই ঠিক করে রাখা ভালো। বিশেষ করে টেকনাফ ও শাহ পরীর দ্বীপ ভ্রমণের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র সাথে রাখা জরুরি, কারণ এটি সীমান্ত এলাকা। খাওয়ার জন্য রামুর স্থানীয় বাজার বা টেকনাফ শহরের হোটেলগুলো বেছে নিতে পারেন যেখানে তাজা সামুদ্রিক মাছ ও ভর্তার চমৎকার আয়োজন থাকে। বাজেট সাশ্রয় করতে চাইলে লোকাল জিপ বা সিএনজি ব্যবহার করা যায়, তবে দলবেঁধে ঘুরলে জিপ বা মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে নেওয়া সবচেয়ে আরামদায়ক।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad