কিয়ার স্টারমার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শিগগিরই পদত্যাগ করবেন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক এক্স পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘স্টারমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়ে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছেন-অভিবাসন ও জ্বালানি। উত্তর সাগরের তেলক্ষেত্র খুলুন! আমি তার মঙ্গল কামনা করি!’
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সোমবারের মধ্যেই নিজের পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণা করতে পারেন- এমন গুঞ্জন জোরালো হচ্ছে। ক্ষমতার লাগাম অন্যের হাতে তুলে দিতে নিজ দল লেবার পার্টির চাপের মুখে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে ধারণা করছেন কূটনৈতিক বোদ্ধারা।
স্টারমার সত্যিই এমন ঘোষণা দিলে, তিনি হবেন এই দশকের মধ্যে ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী, যিনি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে দাঁড়িয়ে বিদায়ের ঘোষণা দেবেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পার্লামেন্টের একটি আসনের উপনির্বাচনে নিজ দলের ভেতরের প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ডি বার্নহামের জয়ের পর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় আছেন স্টারমার। গত সপ্তাহ পর্যন্ত গ্রেটার ম্যানচেস্টারের লেবার মেয়র থাকা বার্নহাম দল ও দেশের নেতৃত্বে স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ করার লক্ষ্য নিয়েই নির্বাচনে লড়েছেন।
বার্নহামের সোমবার সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা।
অবশ্য স্টারমারের দপ্তর পদত্যাগসংক্রান্ত খবর নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে তার ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল রোববার বলেন, ‘স্টারমার নিজেকে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও সুযোগের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন, তা নিয়ে ভাবার জন্য সময় নিচ্ছেন।’
স্টারমার সরে দাঁড়ালে বার্নহাম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন, নাকি তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হবে- সেটিও স্পষ্ট নয়। স্টারমারের নেতৃত্বের প্রতিবাদে গত মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন ওয়েস স্ট্রিটিং। তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে তিনি লড়বেন।
যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অসন্তোষ গত কয়েক মাস ধরেই বাড়ছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে স্টারমার মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টিকে বিপুল নির্বাচনি জয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার পর থেকে সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। সেই পতন ঠেকাতে লেবার আইনপ্রণেতারা মরিয়া হয়ে ওঠেন।
প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনা, ভেঙে পড়া জনসেবা মেরামত এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে স্টারমার হিমশিম খেয়েছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ধারাবাহিক ভুল পদক্ষেপে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইনের কেলেঙ্কারিতে জড়িত বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, লেবার পার্টি দ্রুত বেড়ে ওঠা গ্রিন পার্টির কাছে উদারপন্থী ভোটার হারাচ্ছে। একই সঙ্গে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন অভিবাসনবিরোধী রিফর্ম ইউকে দলও শক্তিশালী হচ্ছে। জাতীয় জনমত জরিপগুলোতে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে আছে এই ছোটদলগুলো।
এদিকে যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেন। স্টারমারের সম্ভাব্য বিদায়কে তিনি বারবার নিজের তোলা দুটি অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করেন- অভিবাসন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘কিয়ার স্টারমার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করবেন। তিনি ব্যর্থ হয়েছেন অভিবাসন ও জ্বালানিখাতে।’
তবে স্টারমারের পরিকল্পনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প এমন মন্তব্য করেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। এমনকি পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে দুই নেতার মধ্যেও কোনো কথা হয়নি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও স্টারমারের মধ্যে শুরুতে উষ্ণ সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা তিক্ত হয়েছে। এর পেছনে ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুও ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাজ্য বারবার ট্রাম্পের অনুরোধ সত্ত্বেও ওই যুদ্ধে অংশ নেয়নি।
স্টারমারের ওই সিদ্ধান্ত অবশ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ প্রশংসা পেয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইউক্রেনের পক্ষে ইউরোপীয় সমর্থন জোগাড় করা এবং ইরান সংঘাতের কারণে তৈরি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কমানোর চেষ্টায় তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে, অনেক লেবার আইনপ্রণেতা বার্নহামের পক্ষে দাঁড়ালেও কেউ কেউ বলেছেন, স্টারমারের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করা হয়েছে। লন্ডনের আইনপ্রণেতা নিল কয়েল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘পুরোপুরি সাজানো ব্যবস্থার সম্ভাবনা এবং সংবাদমাধ্যমের তামাশাকে পুরস্কৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি লিখেছেন, ‘পরবর্তী নেতা রাতারাতি ট্রাম্প, ইরান, ইউক্রেন, পুতিন, মাস্ক, সম্প্রচারমাধ্যমের সম্পাদকীয় পক্ষপাত ও অ্যালগরিদমের পক্ষপাত বদলাতে না পারলে, তার বিরুদ্ধেও একইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে সবাই। বরং সেই গিলোটিন ধারালো রাখাই ভালো।’


