স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে হাবিবুর রহমানের পুনঃনিয়োগ ঘিরে চলমান পর্ষদীয় দ্বন্দ্ব এবার সহিংসতা ও প্রকাশ্য হুমকিতে রূপ নিয়েছে। এমডি নিয়োগ নিয়ে বিরোধের জেরে পরিচালক অশোক কুমার সাহার বাসার সামনে গুলি ছোড়া, চিরকুট পাঠিয়ে প্রাণনাশের হুমকি এবং পরে এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।
এই পরিচালক স্টান্ডার্ড ব্যাংকের এমডি হিসেবে হাবিবুর রহমানের পুনঃনিয়োগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এছাড়া হাবিবুর রহমানের পুনঃনিয়োগের বিপক্ষে থাকা স্বতন্ত পরিচালক গোলাম হাফিজ আহমেদকে গত ১৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই অপসারণ করেছেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল আজিজ। এমনকি বোর্ড সভার আগেরদিন এমডির বিপক্ষে থাকা একজন পরিচালক পুরনো মামলায় ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোন স্বতন্ত্র পরিচালককে অপসারণ করতে পারে না বোর্ড।
স্টান্ডার্ড ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, ২২ জানুয়ারি পর্ষদ সভায় এমডি হিসেবে হাবিবুর রহমানের পুনঃনিয়োগ নিয়ে আলোচনার কথা ছিল। ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, সুপার মেজরিটি ছাড়া হাবিবুর রহমানকে পুনঃনিয়োগ দেওয়া যাবে না, যার বিরুদ্ধে ওঠা বেশ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদকে অনুসন্ধান পরবর্তী পর্যালোচনাধীন রয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, এমডির পুনঃনিয়োগের বিষয়ে পর্ষদে সুপার মেজরিটি নিশ্চিত করতেই হাবিবুর রহমানের পক্ষের শক্তিগুলো বিপক্ষের পরিচালকদের সভা থেকে দূরে রাখতে সহিংস ও অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি বেছে নিয়েছে।
ধানমন্ডি থানায় করা সাধারণ ডায়েরি অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিটে দুইটি মোটরসাইকেলে করে আসা চারজন অজ্ঞাত ব্যক্তি ধানমন্ডি ৯/এ এলাকার একটি ভবনের সামনে হাজির হয়। তারা ভবনের দারোয়ানকে পিস্তল ঠেকিয়ে একটি খাম ধরিয়ে দেয় এবং সেটি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক অশোক কুমার সাহার বাসায় পৌঁছে দিতে বলে।
ডায়েরিতে বলা হয়, ঘটনাস্থল ত্যাগের সময় ওই ব্যক্তিরা এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। তারা ভবনের ইন্টারকম ভেঙে ফেলে, তার ছিঁড়ে দেয়, সিসিটিভি মনিটর ভাঙচুর করে এবং সিসিটিভির হার্ডডিস্ক নিয়ে যায়।
পরে খামটি খোলা হলে একটি হুমকিমূলক চিরকুট পাওয়া যায়। সেখানে লেখা ছিল, ‘মি. অশোক। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সভায় তুমি যাচ্ছো না। যদি যাও তাহলে তোমার ফেরার রাস্তা বন্ধ। আর যদি ফিরে আসো তাহলে তুমি সারা জীবন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। কথার বাইরে গেলে তোমার শ্রাদ্ধ খাব আমরা। পুঁজিবাদের দোসর হয়ে আমাদের হত্যা করতে বাধ্য করো না। পরিবার সবারই আছে।’
জিডিতে উল্লেখ করা হয়, অশোক কুমার সাহা বর্তমানে পরিবারসহ চট্টগ্রামে বসবাস করেন। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বোর্ড সভায় তার উপস্থিত থাকার কথা ছিল। এই হুমকির ঘটনার পর থেকে অশোক কুমার সাহার পরিবার এবং তার শ্যালক নন্দন কুমার সাহার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে ডায়েরিতে বলা হয়েছে।
নন্দন কুমার সাহা ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা সাধারণ ডায়েরিতে জানান, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও আইনগত সুরক্ষার জন্যই তিনি বিষয়টি নথিভুক্ত করেছেন। ডায়েরিটি গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে থানা কর্তৃপক্ষ।
এই ঘটনায় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এমডি নিয়োগকে ঘিরে চলমান দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর আগেই হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করে ব্যাংকের বোর্ড সভা নিয়ে জাল কার্যবিবরণী, আইন ভেঙে স্বতন্ত্র পরিচালক অপসারণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে বিতর্কিত প্রস্তাব পাঠানোর অভিযোগ ওঠে।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি নিয়োগকে কেন্দ্র করে পর্ষদের দ্বন্দ্ব এমন সহিংস পর্যায়ে নেমে আসা পুরো খাতের সুশাসনের জন্য গুরুতর হুমকি।
এ বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


