গুম ও খুনের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তিন মামলার অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ দেওয়ার দিন ধার্য করা হয়েছে।
জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুমের মামলায় ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের আদেশ দেওয়া হবে। এ ছাড়া, টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুমের অপর ঘটনা ও রাজধানীর রামপুরায় ২৮ হত্যার মামলায় ২১ ডিসেম্বর আদেশের দিন ধার্য হয়েছে।
রোববার তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর পক্ষে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার এ আদেশ দেন। অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এর আগে বেলা ১২টা ১৯ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্য এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। ১২টা ৫ মিনিটের দিকে সেনা কর্মকর্তাদের আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও গাজী তামিম।
টিএফআই সেলে গুমের ঘটনায় গ্রেপ্তার সাত সেনা কর্মকর্তার পক্ষে তাবারক হোসেন বলেন, প্রসিকিউশনের প্রতিটি অভিযোগে সমগ্র বাংলাদেশকে ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের সময়ও সুনির্দিষ্ট নয়।
ট্রাইব্যুনাল বলে, ‘এসব যুক্তি আমরা বিচারের সময় দেখব। এখন এগুলো শুনানির সময় নয়। আসামি নির্দোষ কি না, এ বিষয়ে আমরা এখনই বলতে পারছি না। সেজন্য মামলাটি বিচারের পর্যায়ে নিতে হবে।’
আইনজীবী দাবি করেন, এ মামলায় অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি নেই। জবাবে ট্রাইব্যুনাল বলে, আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রাইমাফেসি আছে। ঘটনার পুরো সময়ে আপনার মক্কেল উপস্থিত ছিলেন না, এটা দেখাতে পারলেও একটা কথা থাকত। কিন্তু আপনি তা দেখাতে পারছেন না।
তাবারক হোসেন বলেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আসা ব্যাপকভিত্তিক, লক্ষ্যভিত্তিক ও পদ্ধতিগতভাবে নামক শব্দগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। পদ্ধতিগতভাবে শব্দের অর্থ কী? গুমের ঘটনায় তিন/চার জন ডিআইজি জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়নি।
শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন শুনানি করেন। তিনি অভিযোগ থেকে আসামির অব্যাহতি চান। তাকে আদালত জিজ্ঞেস করে, গুমের সংস্কৃতি দেশে কবে শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৭২ সাল থেকে। এটি বন্ধে কেউ ব্যবস্থা নেয়নি।
তিনি বলেন, হাসিনা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, প্রসিকিউশন এমন দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে বিরোধীপক্ষ না এলে কি হাত-পা ধরে আনা হবে? হাসিনা গুমের নির্দেশ দিয়েছেন, এমন কোনো প্রমাণ প্রসিকিউশন দিতে পারেনি।
কামাল, তারিক ও বেনজীরের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হাসান ইমাম এবং খুরশিদ, হারুন ও খায়রুলের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী সুজা মিয়া শুনানি করেন। তারা অভিযোগ থেকে আসামিদের অব্যাহতি চান। গ্রেপ্তার তিন সেনা কর্মকর্তার পক্ষে আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ শুনানি করেন।
টিএফআই সেলে গুমের ঘটনায় ১৭ আসামির মধ্যে ১০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারা সেনা কর্মকর্তা। এই তালিকায় আছেন কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, কর্নেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল মো. কামরুল হাসান, কর্নেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল মোমেন, লেফটেনেন্ট কর্নেল মো. সারোয়ার বিন কাশেম, লেফটেনেন্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল ও লেফটেনেন্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন।
পলাতক সাত আসামি হলেন পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি এম খুরশিদ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মো. হারুন অর-রশিদ এবং লেফটেনেন্ট কর্নেল মো. খায়রুল ইসলাম।
এ ছাড়া, জেআইসিতে গুমের ঘটনায় আসামি ১৩ জন। তারা হলেন শেখ হাসিনা, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক, লেফটেনেন্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক, মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ, মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজহার সিদ্দিকী। এদের মধ্যে শেষোক্ত তিনজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
উল্লেখ্য, এই ৩০ জনের মধ্যে হাসিনা ও তারিক সিদ্দিকী দুটি মামলায়ই আসামি। ফলে আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮।
রামপুরায় হত্যাকাণ্ডের মামলার চার আসামির মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম, ঘটনার সময় বিজিবিতে ছিলেন। বাকি দুই আসামি, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান পলাতক।


