সুদানের আবেইতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত চার বাংলাদেশি সেনাসদস্যের বাড়িতে এখন শোকের মাতম। নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষা করছে তাদের পরিবার।
বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন সবুজ মিয়ার মা
হামলায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর ‘সবুজ মিয়া’ নামে একজন নিহত হয়েছেন। তিনি মিশনে লন্ড্রি কর্মচারীর দায়িত্ব পালন করছিলেন।
নিহত সবুজ মিয়া উপজেলার মহদীপুর ইউনিয়নের আমলাগাছি (ছোট ভবনপুর) গ্রামের মৃত হাবিদুল ইসলামের ছেলে।

মহদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফিরোজ আকন্দ বলেন, প্রায় সাত-আট বছর আগে সবুজ মিয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে লন্ড্রি কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবুজ মিয়া ছিলেন ছোট। তার বোনের বিয়ে হয়েছে। তিনি এক বছর আগে বিয়ে করেন। তিন মাস আগে ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন, পরে আবার যোগ দেন কর্মস্থলে।
‘ছেলের মৃত্যুর খবরে মা ছকিনা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তার স্ত্রীর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা’, বলেন তিনি।
পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জাবের আহমেদ বলেন, নিহতের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।
মাসুদ রানা বলেছিলেন ‘ডিউটি কম, কষ্ট নাই’
একই মিশনে নিহত হন নাটোরের লালপুর উপজেলার আরবাব ইউনিয়নের বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের সেনাসদস্য কর্পোরাল মাসুদ রানা (৩০)। তার মৃত্যুতে পুরো এলাকা জুড়ে বইছে শোকের মাতম।
মাসুদ রানা লালপুর উপজেলার আরবাব ইউনিয়নের বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের সাহার উদ্দিনের ছেলে।
নিহতের পরিবার জানায়, তিন ভাইয়ের মধ্যে মাসুদ রানা ছিলেন সবার বড়। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। তার মেজো ভাই মনিরুল ইসলাম ২০১২ সালে এবং ছোট ভাই রনি আলম ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। সর্বশেষ শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার আগে মাসুদ রানা যশোর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন।
মা মর্জিনা খাতুন ছেলের মৃত্যুর খবরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কালই (শনিবার) ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। ডিউটির কষ্টের কথা জানতে চাইলে সে বলল, মা এখন আর কষ্ট নাই, ডিউটি কম। আমাকে ভালো থাকতে বলে ছেলে নিজেই চলে গেল।’
নিহতের স্ত্রী আসমাউল হুসনা আঁখিও স্বামীর মৃত্যুসংবাদে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। কথা বলতে গিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি।
ছোট ভাই রনি আলম বলেন, ‘দেশের জন্য আমার ভাই শহীদ হয়েছেন। যদিও শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো না, তবুও এই আত্মত্যাগে আমরা গর্বিত।’
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, ‘খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ পরিবারের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
মৃত্যুর আগে ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন শান্ত ও মমিনুল
সেনাসদস্য শান্ত মন্ডল (২৬) ও মো. মমিনুল ইসলাম ( ৩৮) ওই সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হয়েছেন। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা নিজ নিজ পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন।

জানা গেছে, সেনাসদস্য শহীদ শান্ত মন্ডলের গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাটমাধাই ডারারপাড় গ্রামে। শান্ত ২০১৮ সালে সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন। তিনি সর্বশেষ বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে সৈনিক পদে ছিলেন। গত ৭ নভেম্বর তিনি শান্তিরক্ষী মিশনে সুদানে যান। তার বাবা নুর ইসলাম মন্ডল সাবেক সেনা সদস্য। শান্তর বড় ভাই সোহাগ মন্ডল সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ল্যান্স করপোরাল পদে রয়েছেন।
শহীদ শান্তর বড় ভাই সোহাগ মন্ডল বলেন, ‘শনিবার সন্ধ্যায় শান্ত ভিডিও কলে বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলেছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে খবর পাই ওদের ক্যাম্পে হামলা হয়েছে। হামলায় শান্ত মারা গেছে। আমরা এখন তার লাশের অপেক্ষায় আছি। বাড়িতে বাবার কবরের পাশে তাকে কবর দিতে চাই।’
‘এক বছর আগে বিয়ে করেন শান্ত। তার স্ত্রী বর্তমানে পাঁচ মাসের অন্ত:সত্ত্বা’ বলেও জানান তিনি।
অপর নিহত মমিনুল ইসলামের বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পান্ডুল ইউনিয়নের পারুলেরপাড় গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে। শনিবার বিকালে ভিডিও কলে বাড়ির সবার সাথে শেষবারের মতো কথা হয় তার। এরপর রাত ১১টার দিকে তার মৃত্যুর খবর জানতে পারে পরিবার।

মমিনুলের বাবা আব্দুল করিম বলেন, ‘আমার ছেলে অনেক ভালো মানুষ। এলাকার সবাই তাকে ভালোবাসতো। আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন বলেই হয়তো তার শহীদী মৃত্যু হয়েছে। এখন আমরা তার লাশের অপেক্ষায় আছি।’
মমিনুলের ভাই মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘আমি গত রাতে ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পাই। এরপর ক্যান্টনমেন্টে যোগাযোগ করি। কবে লাশ আসবে তা জানি না, তবে নিয়ম মেনে লাশ হস্তান্তর করা হবে।’
‘ডিউটিতে গিয়ে আর ফিরল না আমার ছেলে’
সুদানের আবেইতে শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো শামীম রেজার বাড়ি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মৃগী ইউনিয়নে।
তিনি হোগলাডাঙ্গী গ্রামের আলমগীর ফকিরের বড় ছেলে। শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিতে গত ৭ নভেম্বর সুদানের আবেইতে যান তিনি।
রোববার বিকালে তার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে পরিবারসহ পুরো গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
পরিবারসূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় হোগলাডাঙ্গী কামিল মাদ্রাসা ছাত্র ছিলেন শামীম রেজা। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন। চার ভাই ও বোনের মধ্যে শামীম রেজা ছিলেন সবার বড়। তার বাবা স্থানীয় একটি মসজিদের মোয়াজ্জেম। দেড় বছর আগে বিয়ে করেন শামীম।

নিহত শামীম রেজার বাবা আলমগীর ফকির বলেন, ‘আমি কৃষিকাজ করে শামীমকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলাম। শুক্রবারও ছেলের সঙ্গে আমার ভিডিও কলে কথা হলো। বললাম, মুনি কেমন আছো, তোমার চোখ ফুলে গেছে কেন? সে বলল, ঘুমায় ছিলাম বাবা। তখন আমার ছেলে বলল, আব্বা তুমি ভালো থাকো। আমি ডিউটিতে যাবো। ওই ছিল তার শেষ কথা। ডিউটিতে গিয়ে আর ফিরল না আমার ছেলেটা। শনিবার রাত ১২টার দিকে আমরা খবর পাই আমার ছেলে আর নেই।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘দেড় বছর আগে কুষ্টিয়ার খোকসায় বিয়ে করে শামীম। ওর স্বপ্ন ছিল ছোট ভাই-বোনদের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে। আমার মেজ ছেলেকে সে সৌদি আরব পাঠিয়েছে। ছোট ছেলেকে সিঙ্গাপুর পাঠানোর জন্য পাসপোর্ট করেছে। মিশন থেকে ফেরার সময় বোনের জন্য সোনার গয়না আনতে চেয়েছে। সব স্বপ্নই এক নিমিষে শেষ হয়ে গেল।’
নিহত শামীম রেজার ছোট ভাই সোহান ফকির বলেন, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে মঙ্গলবার ভাইয়ের মরদেহ দেশে আসতে পারে।
মৃগী ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডে ইউপি সদস্য মোস্তফা কামাল বলেন, ‘শামীম রেজা অনেক স্বপ্ন নিয়ে শান্তিরক্ষা মিশনে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুদানে সন্ত্রাসী হামলায় তিনি নিহত হন। আমরা চাই দ্রুত তার মরদেহ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।’

এদিকে বিকাল ৪টার দিকে রাজবাড়ী সদর সেনা ক্যাম্পের একটি দল শামীম রেজার গ্রামের বাড়িতে তার পরিবারের খোঁজখবর নিতে আসে। এসময় তারা শোকসন্তপ্ত শামীমের পরিবারের প্রতি সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানান।
এর আগে, শনিবার সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ড্রোন হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয়জন সদস্য নিহত হন। এ হামলায় আরও আটজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।


