খাগড়াছড়িতে চলমান উত্তেজনা এবং অবরোধের মধ্যে সোমবার আন্দোলনকারী ‘জুম্ম ছাত্র-জনতার’ প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রশাসনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে আলোচনার পরেও ১৪৪ ধারা ও অবরোধ প্রত্যাহারের কোনো ‘সিদ্ধান্ত হয়নি’ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আন্দোলনকারীরা আট দফা দাবি তুলে ধরেন।
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের সাথে আমাদের আলাপ হয়েছে। তারা আমাদেরকে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছে।’
‘আমরা বলেছি তারা অবরোধ প্রত্যাহার করলে আমারও ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করব। আলোচনা শুরু হয়েছে কেবল, দেখা যাক।’
সোমবার ‘জুম্ম ছাত্র-জনতার’ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনাদেরকে বলি, আজকে এই যে জুম্ম ছাত্র জনতা, না জনতার নামে যে গ্রুপটা হয়েছে, তাদের সাথে আমি আজকে কথা বলেছি। ছয়জন এসেছিল তারা এবং আপনাদেরকেই বলি একটা জিনিস, এই ছয়জনই হচ্ছে ইউপিডিএফ।’
‘কারণ খাগড়াছড়ি এলাকায় ইউপিডিএফ ছাড়া কোনো কিছু নাই। আমি একে একে জিজ্ঞেস করলাম কয়জন বাকি এখানে ইউপিডিএফ এর বাইরে? বলে যে “আমরা ছয়জনই ইউপিডিএফ। আমাদের কোনো অপরাধ নয় এটা। মতাদর্শগত মতাদর্শ থাকতেই পারে।”
‘কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে যে, এই স্কোপটা আমি দেব কেন তাদেরকে? স্কোপ দেওয়ার দরকার আছে? দরকার নাই।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি আজকে এদেরকে বলেছিলাম, দেখুন আপনারা গত কয়েকদিনে যা যা করলেন, আমার মনে হয় নাই এটা ম্যাচিউরড ওয়েতে হয়েছে। ম্যাচিউরিটির কমতি এখানেই আছে।’
‘আরে ভাই একটা ইস্যু নিয়ে আমরা করব। এটাকে আমি যখন মাল্টি… ইয়েতে নিয়ে যাব, বাইরের লোকজন ঢুকে পড়বে। এই সুযোগ দিচ্ছি কেন আমি? সুতরাং একটা ইস্যু নিয়ে থাকেন, অবজেক্টিভ ফুলফিল করেন।’
এদিকে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতার’ প্রতিনিধিরা প্রশাসনের মৌখিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানান। তাদের দাবি, ১৪৪ ধারা অবরোধ তুলে না দিলে আদৌ প্রত্যাহার হবে না। এছাড়া ‘আন্দোলনের বৈধতা এবং ন্যায়বিচারের’ জন্য তারা তাদের পথ অব্যাহত রাখবে।
এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি স্কুলছাত্রী ধর্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন। এ ঘটনার পর থেকে পাহাড়ে শনিবার একদিনের অবরোধ ও পরদিন রোববার থেকে শুরু হওয়া ‘অনির্দিষ্টকালের’ অবরোধের কারণে খাগড়াছড়িতে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় একযোগভাবে বন্ধ হয়ে যায়। রাঙামাটিতে অবরোধে দূরপাল্লার যান চলাচল বন্ধ রয়েছে, তবে অপর জেলা বান্দরবানে অবরোধের কোনো প্রভাব পড়েনি।
অবরোধের ফলে খাগড়াছড়ি জেলার সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। তিন দিন ধরে যান চলাচল বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এমনকি সাজেক পর্যটন এলাকা থেকে ৫১৮ জন পর্যটককে সেনা নিরাপত্তায় খাগড়াছড়ি শহরে ফিরিয়ে আনা হয়।
তবে সোমবার সকাল থেকে খাগড়াছড়ির সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ শিথিল হলেও রাঙামাটি, দীঘিনালা, পানছড়ি, মাটিরাঙা ও অন্যান্য উপজেলায় যান চলাচল বন্ধ ছিল।
অবরোধের ভেতর রোববার পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় নিরাপত্তা বাহিনী, বাঙালি বসতি স্থাপনকারী (সেটেলার) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় গুলিবিনিময়ে অন্তত তিনজন পাহাড়ি নিহত হয়েছেন এবং ১৩ সেনা সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ১৪৪ ধারা লঙ্ঘন করে গুইমারার রামসু বাজারে দুপুরে দিকে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় দুর্বৃত্তরা কয়েকটি দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এ সহিংসতার পর, ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ ফেসবুক পোস্টে তিন পার্বত্য জেলা—রাঙামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়িতে ‘অনির্দিষ্টকালের’ অবরোধ ডেকেছে। পাহাড়ি স্কুলছাত্রী ধর্ষণের প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে এর আগে শনিবার অবরোধ চলছিল। সে দিনও কয়েক দফা সংঘাত হয়।


