দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার সুযোগ বর্তমান সরকারপ্রধানের সামনে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির।
তিনি বলেছেন, জনগণ গণভোটের মাধ্যমে যে মতামত দিয়েছে, তা মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়েই নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হবে। সরকারপ্রধানকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তিনি রাষ্ট্রনায়ক হবেন, নাকি দলীয় নেতা।
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে ‘গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরাম’ আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি। ‘গণভোট ও জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা’ শীর্ষক সেমিনারে উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণের আলোকে গণভোটের নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে আলোচনা হয়।
শিশির মনির বলেন, ‘সত্যকে রিসিভ করার মধ্যেই নেতার বা নেতৃত্বের ওপেন হার্ট প্রকাশ পায়।’ তার ভাষায়, বর্তমান সরকারপ্রধানের রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সুন্দর সুযোগ। এখন তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন রাষ্ট্রনায়ক হবেন নাকি দলীয় নেতা।’
গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তিতে শিশির মনির সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিই সংবিধান। গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়কে সাংবিধানিক মূলনীতির আলোকে বিবেচনা করতে হবে।
সেমিনারে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই সনদে মৌলিক আকাঙ্ক্ষা, সংস্কারের জায়গায় ভিন্নতা তৈরি করছেন। মুখে বলছেন অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করছেন আবার পাতায় পাতায় অস্বীকার করছেন। এটা স্ববিরোধিতা, নির্বুদ্ধিতা।
তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সুবিচার করতে হলে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। তার ভাষায়, ‘অবশ্যই সংবিধান নতুন রূপে প্রণয়ন করতে হবে, যেটার রায় জনগণ দিয়েছে।’
তিনি প্রশ্ন করেন, জনগণ বলছে, আমি সংবিধানটা বদলে দিতে চাই। ৭ অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে, জনগণের অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশটাই হচ্ছে সংবিধান। তাহলে আমার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে একটা নতুন সংবিধান। আপনি ৭২-এর সংবিধান মাঝখানে আনলেন কোত্থেকে?
তার অভিযোগ, সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে পুরোনো সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি বলেন, সংবিধানের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়ার বুদ্ধিটা হচ্ছে আওয়ামী লীগের। আপনারা কেন আওয়ামী লীগের প্রজেক্ট বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিচ্ছেন?
বিএনপির উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেন এবি পার্টির ব্যারিস্টার ফুয়াদ। তিনি বলেন, ‘এটাই আপনাদের শেষ রাজনৈতিক সুযোগ।’ তার মতে, অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সংকটে পড়তে পারে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম বলেন, ‘জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ তার সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকার ফিরে পেয়েছে।’
তার অভিযোগ, বিভিন্নভাবে জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ ও গণভোটের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের পরিণতিতেই ৫ আগস্টের ঘটনা ঘটেছে।
সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, অর্থনৈতিক সংকটও মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। তিনি বলেন, সরকারের কোনো আর্থিক স্পেস কিংবা ফরেন এক্সচেঞ্জ নেই। সরকার জ্বালানি সমস্যা সমাধান করতে পারছে না।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি চলে দুর্নীতির ওপরে। কেবল সীমিত সংশোধনের মাধ্যমে পুরোনো কাঠামো বহাল রাখলে প্রকৃত সংস্কার হবে না।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন, তাজনুভা জাবিন, রুবি আমাতুল্লাহ, আরিফ সোহেল, নাঈম আহমাদ ও সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন। সভাপতিত্ব করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেন গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর।


