রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে মাঝরাস্তায় বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো এখন নিয়মিত দৃশ্য। এর ফলে পেছনে যানবাহনের লম্বা লাইন তৈরি হচ্ছে। অথচ কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের খুব একটা কঠোর হতে দেখা যায় না।
তারা মামলার বদলে কেবল হাত নেড়ে বা লাঠি উঁচিয়ে বাসগুলোকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সংকেত দেন। ঠিক একই জায়গায় কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেল সামান্য নিয়ম ভাঙলে তাদের গুনতে হচ্ছে চড়া জরিমানা।
‘টাইমস অব বাংলাদেশের’ অনুসন্ধানে রাজধানীর প্রধান মোড়গুলোতে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের এই বৈষম্যমূলক চিত্র ধরা পড়েছে। সরেজমিন পর্যবেক্ষণ, যাত্রী ও চালকদের অভিজ্ঞতা এবং সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গণপরিবহনগুলো অধিকাংশ সময় শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা শাহবাগে দেখা যায়, কাছেই নির্ধারিত স্টপেজ থাকলেও বাসগুলো রাস্তার মাঝখানেই থামছে। এতে নিমেষেই যানজট লেগে যাচ্ছে। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা লেজার লাইট বা বাঁশি বাজিয়ে বাস সরানোর চেষ্টা করেন। বাস চলে যাওয়ার পর তারা জট সামলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন, আইন ভঙ্গের জন্য জরিমানা করেন না। অথচ সেই একই মোড়ের একটু দূরেই অবৈধ পার্কিং বা দাঁড়ানোর দায়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলকে নিয়মিত মামলা দেওয়া হচ্ছে।
রমনা ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম লিটন এই বিষয়ে তার সীমাবদ্ধতার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘ব্যস্ত সময়ে বাস থামিয়ে মামলা করতে গেলে যানজট আরও বেড়ে যায়। তাই আমরা কেবল তাদের সামনে এগিয়ে যেতে বলি। পিক আওয়ারে মামলা দেওয়ার সুযোগ খুব কম থাকে।’
একই চিত্র দেখা গেছে বাংলামটর, ফার্মগেট ও মহাখালীতে। বাংলামটরে বাসের মধ্যে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা চলে। পুলিশ তখন কেবল তাদের মৌখিকভাবে সতর্ক করে।
ফার্মগেটে নির্ধারিত ‘বাস বে’ থাকলেও বাসগুলো মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে এক বা দুটি লেন দখল করে রাখে। মহাখালীর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে রাস্তার ওপর বাস থামানো তো আছেই, তার ওপর দূরপাল্লার বাসগুলো মূল সড়কের একাংশ দখল করে পার্কিং করে রাখে। এত বিশৃঙ্খলার পরও বাসের বিরুদ্ধে পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।
ট্রাফিক কর্মকর্তাদের দাবি, ব্যক্তিগত যানের তুলনায় বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বেশ জটিল। তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, গণপরিবহনের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে রুট পারমিট ও বিভিন্ন সরকারি কাগজপত্রের সমন্বয় করতে হয়।
এই প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ। এ কারণে রাইড শেয়ারিং বা ব্যক্তিগত গাড়িকে সহজেই জরিমানা করা গেলেও বাসগুলো অনেক ক্ষেত্রে ছাড় পেয়ে যায়।
পরিবহন শ্রমিকরা এই বিশৃঙ্খলার পেছনে বাস মালিকদের চাপিয়ে দেওয়া দৈনিক জমার নিয়মকে দায়ী করেন। বাসচালক শাহিন জানান, দিনশেষে মালিককে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতেই হয়। সেই টাকা জোগাতে তারা মরিয়া হয়ে রাস্তায় যাত্রী খোঁজেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এভাবে যাত্রী না তুললে তাদের টিকে থাকাই দায়।
আরেক বাসচালক মামুন জানান, ট্রিপে লোকসান হলে মালিক তাদের বেতন থেকে টাকা কেটে রাখেন।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল হক এই সমস্যার মূলে দেখছেন বাসের বর্তমান আয় পদ্ধতিকে। তিনি বলেন, যখন বাসচালকের আয় সরাসরি যাত্রীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে, তখন তারা নিয়ম মানার চেয়ে যাত্রী তোলাকেই বড় মনে করে। আয়ের এই কাঠামো না বদলালে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
সড়কে এই দ্বিমুখী আচরণ সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। বেসরকারি চাকরিজীবী আফজাল হোসেন জানান, কারওয়ান বাজার মোড়ে বাসগুলো রাস্তা আটকে রাখলেও তাদের কিছু বলা হয় না। অথচ তিনি নিজে গত মাসে একই জায়গায় অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে জরিমানা খেয়েছেন। বাসায় নোটিশ পৌঁছানোর আগে তিনি জানতেনই না যে তার অপরাধ কী।
রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল চালক হাসান বলেন, ‘আমরা দুই মিনিট দাঁড়ালেই জরিমানা করা হয়। জরিমানা করলে সবার জন্য সমানভাবে করা উচিত।’
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের পরিসংখ্যানও এই বৈষম্যের প্রমাণ দেয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির ছয় দিনে রাজধানীতে মোট ৬ হাজার ৭২৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বাসের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে মাত্র ৩৬৯টি, যা মোট মামলার মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন, আইন প্রয়োগের এই দৃশ্যমান বৈষম্য পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাকে নষ্ট করছে।
এদিকে, পরিবহন শ্রমিকরা ট্রাফিক পুলিশ ও ‘লাইনম্যান’দের বিরুদ্ধে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন। শ্রমিকদের দাবি, প্রতি ট্রিপে ১০০ থেকে ২০০ টাকা এবং মাসিক ৫ থেকে ১২ হাজার টাকা ‘টোকেন মানি’ হিসেবে দিতে হয়। এক হেল্পার জানান, সার্জেন্টকে খুশি রাখতে পারলে রাস্তায় আর কোনো টেনশন থাকে না।
তবে ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। ট্রাফিক পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম লিটন বলেন, চাঁদাবাজির এই অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
অন্যদিকে, ডিএমপির ট্রাফিক উপকমিশনার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, অতীতে কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল যার তদন্ত চলছে। তবে তিনি বলেন, দু-একজনের জন্য পুরো বিভাগকে দায়ী করা ঠিক হবে না। তারা তাদের সাধ্যমতো নগরবাসীর যাতায়াত সহজ করার চেষ্টা করছেন।


