চলচ্চিত্র পাড়ায় একটা কথা প্রচলিত আছে–পর্দায় সিনেমা হিট হোক আর না হোক, এফডিসির নির্বাচন সবসময়ই সুপারহিট! আগামী ৩ জুলাই অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে এবার যেন বিতর্কের খই ফুটছে। হুন্ডি কেলেঙ্কারির ফাঁস হওয়া অডিও, ‘মুজিব কোট’ বিতর্ক, আর জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-আন্দোলনের বিরোধিতা–সব মিলিয়ে নির্বাচনী মাঠ এখন রীতিমতো তপ্ত কড়াই!
‘কোটা ভাই’ জয় চৌধুরীর হুন্ডি-কাণ্ড
এবারের নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে দাঁড়িয়েছেন চিত্রনায়ক জয় চৌধুরী, যিনি ঢালিউডের চেয়েও বেশি পরিচিত বহুল আলোচিত-বিতর্কিত নায়ক জায়েদ খানের ‘ছোট ভাই’ হিসেবে। জায়েদ খান নিজে এখন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার মামলায় ফেরারি, কিন্তু তাতে কী? ছোট ভাই জয় তো মাঠেই আছেন।

নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে জয়ের দুটি অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়ে নেটদুনিয়ায় ‘ভাইরাল’। এক অডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘ভাই, মহিলা এমপি হতে কেউ চায় কি না দেইখেন। আমার কাছে দুটি কোটা আছে।’ ব্যস, অমনি তাকে নিয়ে ট্রোলের বন্যা! অন্য এক অডিওতে আবার ইতালি থেকে ২ লাখ ইউরো হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আনার তদবির করতে শোনা গেছে তাকে।
এই ‘অডিও বোমা’র জবাবে জয় অবশ্য স্বীকার করেছেন গলাটি তারই। তবে তার দাবি, ‘প্রসঙ্গ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গুলশান-বনানীর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিটিংয়ে জাস্ট সুপারিশের কথা বলেছিলাম। কোনো টাকা-পয়সার লেনদেন হয়নি, লাগলে আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চেক করেন!’
জয়ের অভিযোগ, শিল্পী সমিতির নির্বাচন করায় তার এই অডিও ভিন্ন আঙ্গিকে ফাঁস করেছে প্রতিপক্ষ।

মুজিব কোট বনাম ‘আমি তো বিএনপি করি’
অভিনেতা সাইফ খান প্রকাশ্যেই তোপ দেগেছেন জয়ের বিরুদ্ধে, ‘সবাই জানে ও মুজিব কোট পইরা এতদিন সুবিধা নিছে। এখন ভোল পাল্টাইয়া সাধু সাজার চেষ্টা মোটেও সুবিধার ঠেকতাছে না!’
তবে জয়ের ডিফেন্সও বেশ চমৎকার। তিনি বলছেন, ‘রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান আর গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর ভাই সমিতিতে ডোনেশন দিয়েছিল, তাই তাদের ইলেকশনে গেছিলাম। আর সমিতির নেতা হিসেবে সরকারি প্রোগ্রামে তো যাইতেই হয়, তার মানেই আমি আওয়ামী লীগ? আমি যে বিএনপি করি, তা তো সেই আমলের পেপারেই আসছিল!’
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভোলবদলের এই অভিনয়ে দর্শকরা অবশ্য বেশ বিনোদনই পাচ্ছেন।

‘আওয়ামী’ প্যানেলে তারকার মেলা
অভিযোগ উঠেছে, পেছন থেকে এই প্যানেলের রশি টানছেন এবং ক্যাশ জোগাচ্ছেন স্বয়ং ফেরারি জায়েদ খান। এই প্যানেলে ‘মুজিব কোট’ পরা ছবির তালিকায় আছেন আলীরাজ, রোজিনা, পলি, শিরিন শিলা ও হাসান জাহাঙ্গীর। আরও আছেন ছাত্রলীগ থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা উপকমিটির সদস্য আসিফ নূর, যার বনানীর রেস্তোরাঁ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেখভাল করেছেন জয় চৌধুরী।
বাদ যাননি সাবেক সহসভাপতি প্রার্থী ডিএ তায়েবও। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার একটি ছবি শেয়ার করে পরিচালক মনজুরুল ইসলাম মেঘ ফেসবুকে বোমা ফাটিয়ে লিখেছেন, ‘জানতে ইচ্ছা করে, গত ১৭ বছর শেখ হাসিনার গোলামী করে কতটুকু উন্নয়ন করেছেন? বউ ছিলেন আওয়ামী মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী। ব্যক্তি ডিএ তায়েবের উন্নতি হয়েছে, কিন্তু সিনেমার ক্ষতি হয়েছে!

‘সুখে থাকতে ভূতে কিলায়’ শিরিন শিলা
তবে সব বিতর্ককে ছাপিয়ে লাইমলাইট কেড়ে নিয়েছেন চিত্রনায়িকা শিরিন শিলা। ২০২৪ সালের উত্তাল জুলাইয়ে যখন ছাত্ররা রাজপথে, তখন তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন, ‘কিসের এত আন্দোলন, সুখে থাকতে ভূতে কিলায়!’ নেটিজেনদের ধোলাইয়ের চোটে তখন কমেন্ট বক্স বন্ধ করলেও, আজ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাননি এই নায়িকা।
শুধু তা-ই নয়, ক্যাসিনো কাণ্ডের আরমান কিংবা সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে তার ‘ঘনিষ্ঠতা’র পুরনো গুঞ্জনও এখন এফডিসির বাতাসে ভাসছে। এমনকি ২০২৫-এর ঈদে বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘চাওয়া পাওয়া’তে তাকে অতিথি করায় তুমুল বিতর্কের মুখে সেই পর্বটি বাতিল করে নতুন করে শুটিং করতে হয়েছিল।
এতসব কেলেঙ্কারি, বিতর্ক আর ‘ভূতে কিলানো’র গল্প মাথায় নিয়েও প্রার্থীরা কোমর বেঁধে নেমেছেন শিল্পী সমিতির মসনদ দখল করতে। ৩ জুলাইয়ের ব্যালট যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয়ের মালা কার গলায় ওঠে, আর কার মুখোশ খোলে–তা দেখতে পুরো ঢালিউড এখন পপকর্ন হাতে অপেক্ষায়!


