বিশ্বের অনেক দেশের সুপার মার্কেট বা খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে পণ্য পরিবহনের জন্য বিনামূল্যে আলাদা ব্যাগ সরবরাহ করা হয় না। নামমাত্র মূল্যে হলেও গ্রাহককে ব্যাগ কিনে নিতে হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব ব্যাগ হয় পুনর্ব্যবহার্য। অর্থাৎ, একবার কিনলে একাধিকবার ব্যবহার করা যায়।
যেহেতু পণ্য পরিবহনের জন্য ক্যারিব্যাগ কিনে নিতে হয়, তাই ইউরোপ-আমেরিকার মতো দেশের ক্রেতারা সাধারণত কেনাকাটা করতে বের হলে ব্যাগ সঙ্গে নিয়েই বের হন।
তবে আমাদের দেশে এ প্রথার প্রচলন ছিল না। বিশেষ করে প্লাস্টিকের ব্যাগের সহজলভ্যতার পর থেকে কাঁচাবাজারের জন্য ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে বের হওয়ার অভ্যাসও অনেকের বদলেছে। পণ্য কিনলে বিক্রেতাই বিনামূল্যে ব্যাগ দেবেন, এটাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বড় ও বিখ্যাত লাইফস্টাইল পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান আড়ং তাদের গ্রাহকদের বিনামূল্যে ব্যাগ দেওয়া বন্ধ করেছে। কালো লোগো সম্বলিত কমলা রঙের কাগজের যে ব্যাগটি আগে আড়ংয়ের যেকোনো ছোট-বড় পণ্যের সঙ্গে বিনামূল্যে দেওয়া হতো, সেটির জন্য এখন ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ, যা রীতিমতো ক্রেতা প্রত্যাশায় ‘আঘাত’ হেনেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে উঠেছে আড়ংয়ের সমালোচনায়। কাগজের একটি ব্যাগ, যা আগে পাওয়া যেত বিনামূল্যে তার এক্সট্রা স্মল থেকে এক্সট্রা লার্জের দাম ধরা হয়েছে ১০ থেকে ২৫ টাকা। আর এই টাকা দিয়ে যে ব্যাগ কেনা হচ্ছে, সেটি টেকসই নয়। জিনিসপত্র বাসায় বা গন্তব্যে নিতে নিতেই সেটি নরম হয়ে যায়, কখনো কখনো ছিঁড়ে বা ফেটে যায়।
তবে আড়ংয়ে কাপড়ের কিছু পুনর্ব্যবহার্য ব্যাগও বিক্রি করা হচ্ছে, আকারভেদে যার দাম ৬০ ও ৭৫ টাকা।
জনপ্রিয় ব্র্যান্ড আড়ংয়ের এই সিদ্ধান্ত গ্রাহকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আড়ংয়ের পণ্য পছন্দ করেন, নিয়মিত সেখানে কেনাকাটা করেন এমন গ্রাহকদের মধ্যে নেমে এসেছে হতাশাও।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নিশাত ফরজানা এ বিষয়ে আড়ংকে একটি আইনি নোটিশ দিয়েছেন। যেখানে ব্র্যান্ডটিকে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছে। নোটিশে আড়ং এই উদ্যোগকে ‘শোষণমূলক ব্যবসায়িক মানসিকতার উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
নিশাত ফরজানা বলেন, ‘আমি এই অভিযোগ আইনজীবী হিসেবে করিনি, বরং আড়ংয়ের একজন বিশ্বস্ত গ্রাহক হিসেবে করেছি। আমি বহু বছর ধরে আড়ং থেকে পণ্য কিনে আসছি। কিন্তু সম্প্রতি যখন কিছু পণ্য কিনলাম, তখন আমাকে বলা হলো যে আমি ব্যাগটি অবশ্যই কিনতে হবে যাতে আমি পণ্যগুলো বহন করতে পারি। আমি জানতে পারলাম যে তারা এই ব্যাগগুলোর জন্য চার্জ নিচ্ছে কারণ এই অর্থ পরিবেশ রক্ষার কাজে ব্যয় করবে।’

‘যদি তাই হয়, তাহলে তারা কেন গ্রাহকদের কাছ থেকে এমন ব্যাগের জন্য অর্থ নেবে, যেগুলো টেকসইও নয়। এমনকি ব্যাগগুলোর মান খুবই খারাপ। একজন গ্রাহক হিসেবে আমি মনে করি, এইভাবে ব্যাগের জন্য চার্জ নেওয়া অত্যন্ত অন্যায্য।’
ব্যাগের জন্য দাম নেওয়া শুরুর আগে আড়ং এ বিষয়ে প্রচার চালায়। দেশের প্রতিটি আড়ং আউটলেটে এ সংক্রান্ত ফেস্টুন টানিয়ে দেওয়া হয়। যেখানে বলা হয়, ব্যাগ বিক্রির সমস্ত অর্থ তাদের বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে ব্যয় হবে।
তবে অনেক গ্রাহকই এ কথায় বিশ্বাস আনতে পারছেন না। তারা ভাবছেন, আরও অর্থ আয়ের লক্ষ্যেই আড়ংয়ের এই পদক্ষেপ।
ঢাকার ধানমন্ডিতে আড়ংয়ের ফ্ল্যাগশিপ স্টোরে কেনাকাটা করতে আসা এক নারী গ্রাহক বলেন, ‘আড়ং হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রাফট স্টোর। এমন একটি বড় ব্র্যান্ড থেকে এমন উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়।’
আরেক নারী গ্রাহক তার অস্বস্তির কথা জানিয়ে বলেন, ‘পণ্য কেনার পর আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো যে আমি ব্যাগ কিনতে চাই কি না। এটি আমাকে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। আমার কাছে বিষয়টি অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে।’
আড়ং থেকে প্রায় চার হাজার টাকার পণ্য কেনার পর নিজের অভিজ্ঞতা জানালেন একজন পুরুষ ক্রেতা।
তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, আমি কী হাতে পণ্যগুলো বহন করতে চাই নাকি ব্যাগের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে চাই। এটি খুবই অদ্ভুত ও হাস্যকর প্রশ্ন।’
একাধিক গ্রাহক আড়ংয়ের বৃক্ষরোপণের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

এক নারী বলেন, ‘যদি আড়ং সত্যিই গাছ লাগাতে চায়, পরিবেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চায় তাহলে তা করার জন্য যথেষ্ট অর্থ তাদের কাছে আছে। এর জন্য কেন গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যাগের বিনিময়ে নেওয়া অর্থ ব্যবহার করতে হবে?’
পাশে দাঁড়ানো আরও কয়েকজন নারী-পুরুষ গ্রাহক একই মত প্রকাশ করলেন। তারা বলছেন, আড়ং চাইলে নিজের টাকায় গাছ লাগাক। এজন্য ক্রেতাদের চাপ নিয়ে বা বিপাকে ফেলে কেন অর্থ আদায় করতে হবে, প্রশ্নে রাখেন তারা।
দেশের অন্য কোনো ব্র্যান্ড পণ্যের বিপরীতে ব্যাগ কিনতে বাধ্য করে না উল্লেখ করে কয়েকজন গ্রাহক বলেন, কিন্তু আড়ং এমন ব্যবস্থা করেছে যে দামী কোনো কিছু কিনলে বাধ্য হয়েই ক্রেতাকে ব্যাগের জন্য বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
এক নারী বলেন, ‘আমি শপিং করার পরিকল্পনা নিয়ে আসিনি। কিন্তু হুট করেই একটা শাড়ি পছন্দ হয়ে গেছে। এখন এই পাঁচ হাজার টাকার শাড়ি কী আমি হাতে করে বাসায় নিয়ে যাব? আর এত দাম দিয়ে শাড়ি কেনার পর সেটা বহনের জন্য ব্যাগও আমাকেই কিনতে হবে? এটা কেমন কথা!’
এ প্রসঙ্গে কথা বলতে বারবার চেষ্টা করেও আড়ংয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তারা টেলিফোন ধরেননি, ইমেইল করেও উত্তর পাওয়া যায়নি।
ফ্ল্যাগশিপ স্টোর বা অন্যান্য আউটলেটে কর্মরত কর্মীরা বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি।


