জামালপুরের সীমান্তবর্তী উপজেলা বকশীগঞ্জের সূর্যনগর এলাকার ‘নঈম মিয়ার হাট’। সপ্তাহের প্রতি শনি ও মঙ্গলবার দুপুরে এই হাটে গেলে চোখে পড়ে এক ভিন্নরকম দৃশ্য। ঈদগাহ মাঠে বিশাল এক বটগাছের নিচে সারি সারি মাটির হাঁড়ি নিয়ে বসে আছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। হাঁড়ির মুখ খুলতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে খাঁটি মহিষের দুধের সুগন্ধ। ঘন, সাদা আর চাকা চাকা এই দই-ই হলো বকশীগঞ্জের বিখ্যাত মহিষের টক দই।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এবং অনন্য স্বাদের কারণে বকশীগঞ্জের এই দইয়ের খ্যাতি এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে। ভোজন রসিকদের কাছে নঈম মিয়ার হাট এখন মহিষের টক দইয়ের রাজ্য।
বাজারে সচরাচর পাওয়া গরুর দুধের মিষ্টি দই তৈরিতে দীর্ঘ সময় ধরে দুধ আগুনে জ্বাল দিতে হয় ও বীজ ব্যবহার করতে হয়। সেখানে মহিষের টক দই তৈরির প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও শতভাগ প্রাকৃতিক।
স্থানীয় দই বিক্রেতা জালাল মিয়া জানান, মহিষের দুধ সংগ্রহ করার পর তা জ্বাল দেওয়া হয় না। কাঁচা তাজা দুধ ছেঁকে সরাসরি মাটির পাত্রে রাখা হয়। দই জমানোর আগে নতুন মাটির হাঁড়ি ভালো করে ধুয়ে রোদে শুকানো হয়। এরপর সামান্য সরিষার তেল হাঁড়ির ভেতরে মেখে আগুনে হালকা পুড়িয়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়। এভাবে প্রস্তুত করা পাত্রে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় মহিষের খাঁটি কাঁচা দুধ রেখে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। মহিষের দুধে প্রচুর পরিমাণে ফ্যাট ও ন্যাচারাল ক্রিম থাকায় কোনো প্রকার কেমিক্যাল বা কৃত্রিম উপাদান ছাড়াই ২০ থেকে ২৪ ঘণ্টা এবং শীতকালে ২ থেকে ৩ দিন পর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘন চাকা টক দইয়ে পরিণত হয়।

নঈম মিয়ার হাটে ২ কেজি থেকে শুরু করে ১৫ কেজি ধারণক্ষমতার মাটির হাঁড়িতে এই দই বিক্রি হয়। সাধারণ সময়ে প্রতি কেজি দইয়ের দাম থাকে ১২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। তবে রমজান মাস, ঈদ, পূজা বা বিয়ের মতো উৎসব-পার্বণে এই দইয়ের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়, তখন দাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি পর্যন্ত পৌঁছায়।
হাটের ইজারাদার ও স্থানীয় বিক্রেতাদের কাছ থেকে জানা যায়, এই হাটে নিয়মিত দই বিক্রেতা রয়েছেন ২০ থেকে ২৫ জন। প্রতি হাটে ২০০ থেকে ৩০০ কেজি দই বিক্রি হয়। গড়ে প্রতি হাটে লাখ টাকার ওপর দই বেচাকেনা হয়, যা উৎসবের সময়ে ২ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
সীমান্তবর্তী এই হাটে শুধু বকশীগঞ্জ বা দেওয়ানগঞ্জের মানুষই আসেন না। ঢাকা, ময়মনসিংহ, শেরপুর, কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভোজন রসিক ও সাধারণ ক্রেতারা দই কিনতে ছুটে আসেন। অনেকে দূর-দূরান্তে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের জন্য স্পেশাল উপহার হিসেবে এই দই কিনে পাঠান।
হাটে দই কিনতে আসা ক্রেতা মুস্তাইন বিল্লাহ রনি বলেন, এই দইয়ের স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো। সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত ও প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হওয়ায় নিশ্চিন্তে খাওয়া যায়।
মহিষের টক দই স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী বলে জানান বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার মোহাম্মদ তামিম। তিনি বলেন, এতে থাকা প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া হজমশক্তি বাড়াতে এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করতে দারুণ কার্যকর। এছাড়া এতে গরুর দুধের চেয়ে বেশি ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন থাকে, যা হাড় ও দাঁত মজবুত করে। কোনো চিনি বা কৃত্রিম স্বাদ না থাকায় ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য এটি আদর্শ খাদ্য।
বকশীগঞ্জের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে মহিষ পালন সহজ হওয়ায় কয়েক পুরুষ ধরে মহিষের দই তৈরি ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে এই অঞ্চলের শতাধিক পরিবার। তবে স্থানীয়ভাবে কোনো বড় বাণিজ্যিক খামার না থাকায় কৃষকরা নিজেদের গৃহপালিত মহিষের দুধ দিয়েই এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন। উপযুক্ত সংরক্ষণাগার ও আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার অভাবে অনেক সময় প্রান্তিক খামারিরা সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
এ বিষয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন বলেন, মহিষের দই এ অঞ্চলের গৌরবময় ঐতিহ্য। বংশ পরম্পরায় তৈরি হওয়া এই সুস্বাদু দইকে ব্র্যান্ডিং করার এবং এই শিল্পের সাথে জড়িতদের সহায়তার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, দই সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার ব্যবস্থা এবং এই দইকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে বকশীগঞ্জের এই গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।


