রৌমারীতে ভৌতিক বিদ্যুৎ বিল ও গ্রাহক হয়রানি

রৌমারীতে ভৌতিক বিদ্যুৎ বিল ও গ্রাহক হয়রানি
রৌমারী জোনাল অফিস। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন রৌমারী জোনাল অফিসে বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং গ্রাহক হয়রানির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও অভিযোগ উঠেছে । মাঠ পর্যায়ে সঠিক মিটার রিডিং না নিয়ে অনুমাননির্ভর অতিরিক্ত বিল পাঠানো,  গ্রাহকদের নাম ভুল লেখার মত বিষয়ে জোনাল অফিসের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও অপেশাদার আচরণের কারণে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে।

জানা যায়,  রৌমারী উপজেলায় প্রায় প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে। বাকি যে কয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে তাও আবার লো ভোল্টেজের কারণে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। লো ভোল্টেজের কারণে এ অঞ্চলের মানুষদের সেচ, উৎপাদন পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। তার ওপর সবার ইলেকট্রনিকস সরঞ্জাম সহজেই বিকল হয়ে যাচ্ছে।

চুলিয়ারচরের শেখ ফরিদ অভিযোগ করে বলেন, জুলাই মাসে বিলের কাগজ রিডিং দেখায় ৮ হাজার ৩৮০। আবার আগস্ট মাসে বিলের কাগজ রিডিং দেখায় ৮ হাজার ৪৮০।  কিন্তু চলতি মাসে মিটারের রিডিং ৮ হাজার ২৩০।  এ ছাড়াও বিলম্বসহ বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের তারিখ ৮ সেপ্টেম্বর থাকলেও বিল পৌঁছে দেওয়া হয় ৭ সেপ্টেম্বর বিকালে। রিডিংয়ের বিষয়ে অভিযোগ করার পর পাঁচদিন পার হয়ে এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।

রৌমারী উপজেলা সংলগ্ন ছালাম এন্টারপ্রাইজের বিদ্যুৎ বিলের কাগজে মিটারের মার্চ মাসে ৮৩০ রিডিং দেখানো হয়। কিন্তু প্রায় ছয় মাস ধরে ওই মিটারের রিডিং বন্ধ বলে জানান রিডিং রাইটার। আগস্ট মাসে কোনো রিডিং না লিখেই মোট বিল দেখানো হয় ১ হাজার ২৭৮ টাকা। মিটারের রিডিং অচল থাকলেও ছালাম এন্টারপ্রাইজের কর্তৃপক্ষকে তা জানায়নি রৌমারী জোনাল অফিস কর্তৃপক্ষ। অচল মিটারের রিডিং দিয়েই ক্রমাগত বিল দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন ছালাম এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী নাহিদুল হক নাহিদ।

নটানপাড়া হাজিজুর রহমান তুহিনের অভিযোগ, ঝড়ের কবলে আমার বাড়ির মিটারের সংযোগ তার ছিঁড়ে যায় । গত ২৭ জুলাই রৌমার জোনাল অফিসে যোগাযোগ করলে নতুন তার লাগানোর কথা বলে ২৯ জুলাই। ৩০ জুলাই অফিসের ফি বাবদ ২ হাজার ১৫৭ টাকা দেওয়া হয়। এরপর এক সপ্তাহ হয়রানি করেও পুরোনো তারই লাগানো হয়। অফিসে নতুন তার আসলে লাগিয়ে দেওয়া হবে বললেও এখনো পর্যন্ত বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

কলেজপাড়ার বাবুল মিয়া জানান, ‘প্রায় দেড় বছর আমার মিটারের রিডিং অপরিবর্তিত থাকায় প্রতি মাসে নির্ধারিত বিল ২৯৮ টাকা দিতে হয়েছে। অনেক অভিযোগের পর চার দিন আগে মিটার পরিবর্তন করলেও বিলের কাগজে এখনও ২৯৮ টাকা দেওয়া  হচ্ছে। ওই মিটারের বর্তমান রিডিং ১৭৫।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চাক্তাবাড়ির এক মোবাইল কোম্পানির টাওয়ারে কর্মরত এক ব্যক্তি জানান,  ‘গত ১৯ জুলাই সংযোগের জন্য আবেদন করি। ২৬ আগস্ট মিটার লাগানোর কথা থাকলেও ২৪ আগস্ট আবার আমি বিদ্যুৎ অফিসে যাই। সেদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত আমাকে বসিয়ে রেখে লাইনম্যান বলেন, “২৬ তারিখ যাব না, ২৮ তারিখ যাব।” পরে রোববার গিয়ে ক্যাপাসিটর লাগবে বলে জানান। যা ডিমান্ড নোটে ছিল না। অবশেষে, গত ৫ সেপ্টেম্বর সংযোগ দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ অফিসের এমন হয়রানি মেনে নেওয়া যায় না।’

বড়াইকান্দি, দাঁতভাঙ্গা, চরশৌমারী, বাইকামারী ও শৌলমারীর একাধিক গৃহিনী বলেন, ঘনঘন লোডশেডিং ও বিদ্যুতের লো ভোল্টেজ থাকার কারণে ফ্রিজে থাকা মাছ- মাংস সবজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেকের মতে কারো কারো ফ্রিজও নষ্ট হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

একাধিক অটো রিক্সা- ভ্যান ও বোরাক চালকের অভিযোগ করে বলেন, ‘ঠিকমত বিদ্যুৎ না থাকায় পরিপূর্ণভাবে গাড়ি চার্জ দিতে পারি না। যার ফলে ক্ষেপ মারা কঠিন হয়ে পরেছে। আয় কমে গেছে। এই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

এদের মধ্যে অটো ভ্যানচালক মাফুজল বলেন, ‘এই ভ্যান গাড়ি আমার একমাত্র আয়ের অবলম্বন।  চার সন্তান ও এক ছোট ভাই, মাকে দিয়ে সংসার চালাতে পারছি না। মেয়ের স্কুলের বেতন, প্রাইভেটের ফিস কিছুই দিতে পারছি না। বিদ্যুৎ নাই তো আমার সংসার অচল।’

ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপের হাফিজুর বলেন, ‘দিনে ১৬-১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ও লো ভোল্টেজের কারণে কাস্টমারকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছি না কিন্তু  কর্মচারীদের  বেতন ঠিকেই দিতে হয়। যার কারণে মাসে অনেক টাকা লোকসান গুনতে হয়।’

অভিভাবক আলম মিয়া বলেন, ‘প্রায়ই সন্ধ্যায় লোডশেডিং থাকে, ছেলে মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারে না। যে পরিমাণে লোডশেডিং হয় তাতে আইপিএসও কুলায় না। সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ গেলে আসে রাত ৯টা বা সোয়া ৯টায়। এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর আবার যায় আসে। ১২টার পরে তো ছেলে-মেয়েদের ঘুমানোর সময়। তাও ১২টার পর প্রতি রাতে তিন থেকে চারবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করে।’

আদর্শ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ম্যানেজার বলেন, বিদ্যুতের কারণে জেনারেটর চালিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে হয়, এতে লাভের চেয়ে লোকসান কয়েকগুণ বেশি।

রৌমারী জোনাল অফিসের ডিজিএম দেলোয়ার হোসেন জানান, ‘রৌমারী ও রাজিবপুরে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ মেগা ওয়াট, কিন্ত আমরা পাচ্ছি আট থেকে নয় মেগা ওয়াট। যার কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং হয়।’ ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের প্রশ্নে তিনি জানান, মিটারের সমস্যার কারণে এটা হতে পারে।

মিটারের রিডিং অচল থাকলেও বিলের কাগজ দেন কীভাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিগত দিনের বিদ্যুৎ বিলের গড় হিসাব করে দেওয়া হয়। এতে গ্রাহক লাভবান হতে পারেন আবার লোকসানেও পড়তে পারেন। অভিযোগ আমলে না নেওয়া, গ্রাহক হয়রানির ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (অর্থ-রাজস্ব) শাহিদা আক্তার তিনি ঢাকায় আছেন বলে জানান। তার বিভাগীয় পরীক্ষা আছে জানিয়ে তিনি পরে কথা বলবেন বলে গ্রাহক হয়রানির বিষয়টি এড়িয়ে যান।

জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো। সাহিদুল ইসলামকে একাধিবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগে গ্রাহকদের বিক্ষোভ

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad