রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদ্রাসার দেয়াল ধস: মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদ্রাসার দেয়াল ধস: মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি
মহিলা হেফজখানার দেয়াল ধস। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে মহিলা হেফজখানার দেয়াল ধসে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি তথ্যে পাঁচজনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও জরুরি প্রতিক্রিয়া সংস্থা (ইপিআর) ও রোহিঙ্গা শরণার্থী পরীক্ষা বোর্ড (ইবিআরআর) আটজনের মৃত্যুর তথ্য জানায়।

বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে উখিয়ার ক্যাম্প-৫ এর ইরানি পাহাড় এলাকায় অবস্থিত খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানায় এই পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে।

বুধবার রাতে উখিয়া ৫ নম্বর আশ্রয়শিবিরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (সিআইসি) মোহাম্মদ আব্দুর রউফ এক দাপ্তরিক প্রতিবেদনে জানান, পাহাড় ধসের ঘটনায় পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়াও আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে আট শিশু শিক্ষার্থী। তবে এর আগে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে আট শিশুর মৃত্যুর কথা জানিয়েছিলেন।

মোহাম্মদ আব্দুর রউফ দাপ্তরিক প্রতিবেদনে জানান, নিহত শিক্ষার্থীরা হলো ব্লক-১১ এর বাসিন্দা হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩), এফ-১ ব্লকের আবদুস শুকুরের মেয়ে উম্মে নেজাত (১৩), ক্যাম্প-৩ এর আবদুস শুক্কুরের মেয়ে উম্মে সালমা (১২),  ব্লক-৮-এর মোহাম্মদ ইলিয়াছের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩) ও শামসু আলমের মেয়ে শাহিদা (১৩)। এদের মধ্যে উম্মে নেজাত ছাড়া অন্য চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

আহতরা হলো ক্যাম্প-৩ এর দিল মোহাম্মদের মেয়ে আসরা (৯), নুরুল আমিনের মেয়ে বেগম জান (১৫), ক্যাম্প-৫ এর বশির আহমদের মেয়ে ফারেসা বিবি (১২), মোহাম্মদ আজিজের মেয়ে জান্নাত আরা বিবি (৮), শাহ আলমের মেয়ে নুর ফাতেমা (১০), নুর সেহেরা (১২), ইমাম হোসেনের ছেলে আব্দুল মোনাফ (১৭) ও আব্দুস শুককুরের ছেলে নূর কায়েস (১০)।

ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা জানান, পাহাড়ধসের সময় খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন ছাত্রী পাঠ গ্রহণ করছিল। হঠাৎ পাহাড়ের একটি অংশ ধসে ভবনের ওপর পড়ে। এতে ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী মাটিচাপা পড়ে। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন নিজ উদ্যোগে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

তার ভাষায়, খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক এবং পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।

যদিও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তার ৪০-৫০ শিক্ষার্থী চাপা পড়ার বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন।

আরও পড়ুন

উখিয়ায় দায়িত্বরত ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ সিরাজ আমীন সাংবাদিকদের বলেন, ক্যাম্প-৫ এর ইরানি পাহাড় এলাকায় অবস্থিত খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানার ওপর পাহাড়ধসে মাটি চাপা পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচ ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

১৪ এপিবিএনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে ক্যাম্প-৫ এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক চার শিক্ষার্থীকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত সাতজন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এদিকে এর আগে ইপিআর যে তথ্য প্রকাশ করে তাতে বলা হয়, এ ঘটনায় মোট ১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ছয়জন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

ইপিআরের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই মারা যান চারজন। তাদের মধ্যে তিনজন শিশু এবং একজন শিক্ষক রয়েছেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ক্যাম্প-৩-এর জিকে হাসপাতালে দুইজন, ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি হাসপাতালে একজন এবং ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে একজন মারা যান।

এ ছাড়া ইবিআরআর জানায়, মাদ্রাসা ভেঙে পড়ে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে। উদ্ধারকারী দলগুলো প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থীকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে ৮ জন শিক্ষার্থী এই ঘটনায় তাদের মূল্যবান প্রাণ হারিয়েছে।

অন্যদিকে, ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পাহাড়ধসে একটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসার ভেতরে শিশুরা অবস্থান করছিল। ঘটনার পরপরই রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্য এবং ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম উদ্ধার ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম শুরু করে। সম্ভাব্য হতাহতদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আশপাশের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র গুলোকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এ নিয়ে গত তিনদিনে সরকারি হিসাবে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৭ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩ জন রোহিঙ্গা।

গত সোমবার দিবাগত রাতে টানা বর্ষণের মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। একইদিন দুপুরে পেকুয়া উপজেলায় পাহাড়ধসে বসতঘরের দেয়াল চাপা পড়ে সাত বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। এসব ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান বলেন, গত রোববার থেকে বুধবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত জেলায় ৫০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বর্তমানে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad