কক্সবাজার ও উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আলাদা পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।
সোমবার রাত দেড়টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে উখিয়া উপজেলার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। অপরদিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাত্তার ঘোনা এলাকায় আরেকটি পাহাড় ধসের ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা রোহিঙ্গা শিবিরে ৮ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, পাহাড়ধসের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং স্থানীয় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে।
পাহাড় ধসে নিহতরা হলেন পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকের কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) ও চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাস, কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৭ ব্লকের মোহাম্মদ রশিদের ছেলে একরাম (৭), বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-১১ ব্লকের উম্মে হাবিবা (২৭), তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রমতে, রাত দেড়টার দিকে ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর। এতে পরিবারের ১০ সদস্য মাটিচাপা পড়েন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে কামাল হোসাইন, তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম ও তাদের চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাসের মরদেহ উদ্ধার করেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা জীবিত উদ্ধার হলেও তাদের কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এই ঘটনার কিছুক্ষণ পর রাত ২টার দিকে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৭ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে ওই ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ রশিদের সাত বছর বয়সী ছেলে একরামের মৃত্যু হয়।
পরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-১১ ব্লকে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজন নিহত হন। তারা হলেন উম্মে হাবিবা, তানজিনা আক্তার, মোহাম্মদ রিহান ও হারুনুর রশিদ।
অন্যদিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১২নং ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে আলী আকবর (৫০) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ভোররাত ৪টার দিকে ছাত্তার ঘোনা এলাকায় একই পরিবারের ৩ সদস্য পাহাড়ধসে চাপা পড়েন। খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের উদ্ধার করেন। এর মধ্যে গুরুতর আহত অবস্থায় আলী আকবরকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, টানা ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
তিনি সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
উখিয়ার ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) পরিদর্শক শুভেন্দু চ্যাটার্জি জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড়ের পাদদেশে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে টানা বৃষ্টির কারণে শরণার্থী শিবিরজুড়ে নতুন করে পাহাড় ধসের আশঙ্কা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, রোববার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজার জেলায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কয়েকদিনও জেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের মধ্যে অন্তত আটটি ক্যাম্প পাহাড় ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ক্যাম্পে পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালজুড়ে গড়ে ওঠা অস্থায়ী বসতিতে বসবাস করছেন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। বর্ষা মৌসুমে টানা ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলেই তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফলে প্রতিবছরই পাহাড় ধসে প্রাণহানি, আহত এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।


