দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, জ্ঞানচর্চা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবনতির চিত্র তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, শিক্ষক আন্দোলনে রাস্তায় পড়ে থাকা ভাঙা চশমা শিক্ষকদের মর্যাদার প্রতীক।
শনিবার জাতীয় জাদুঘরে অনুষ্ঠিত তার বই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ইতিহাসে, স্মৃতিতে’ গ্রন্থের প্রকাশনা ও আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘দেশে দৃশ্যমান উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু জ্ঞান, শিক্ষা এবং মূল্যবোধের ক্ষেত্রে আমরা ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছি।’
শিক্ষা ও জ্ঞানের এই অবমাননাকে তিনি সাম্প্রতিক শিক্ষক আন্দোলনের এক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেন। লাঠিচার্জের সময় এক শিক্ষক পুলিশ কনস্টেবলকে বলছেন, ‘স্যার, আমাকে পেটাবেন না, আমি একজন শিক্ষক’–এই আর্তনাদে বোঝা যায় সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা কতটা পড়ে গেছে।
দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের উদাহরণ টেনে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এক হাতে ঘুষ নেন, অন্য হাতে জ্ঞানের চর্চা করেন, কিন্তু দুর্নীতি অর্থ সৃষ্টি করায় তার হাত জ্ঞানের চেয়ে দীর্ঘ।’
তিনি মনে করেন, অর্থকেন্দ্রিকতার দাপটে জ্ঞান-মানবিকতা-নৈতিকতার মতো মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে, আর এতে শিক্ষার মর্যাদাও ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষিত হলে যে একজন চাকরি পাবে, জীবিকার সুযোগ পাবে–এটা এখন আগের চেয়ে আরও কম সত্য। জ্ঞানের মূল্য কমে গেছে, শিক্ষার সঙ্গে জীবিকার সম্পর্কটাও দুর্বল।’
রাষ্ট্রের উন্নয়ন মডেলের সমালোচনা করে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘যে উন্নয়ন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে না, সেটা যথার্থ উন্নয়ন নয়।’ দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নতির আড়ালে কর্মসংস্থানহীনতা, দুর্নীতি, মূল্যবোধের অবনতি এবং শিক্ষকদের প্রতি অবহেলা সমাজে গভীর হতাশা তৈরি করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ফিরদৌস আজিম।
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক খায়রুল আলম সবুজ বলেন, ‘ঢাবি শুরু থেকেই ব্রিটিশদের প্রশাসনিক সহায়তা তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তবে এই মাটির মানুষেরা তাদের তাবেদার হয়নি।’
বইটি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এতে এমন কিছু সত্য আছে যেগুলো আমরা জানি না। শুধু ছাত্র নয়, আরও অনেকের পড়া উচিত।’
বেঙ্গলবুকসের প্রকাশক মাহবুদুল হাসান বইটি পড়ার আহ্বান জানান। তরুণ লেখক ও অনুবাদক কাজী সামিও শীশ দ্বিতীয় সংস্করণে কিছু সংশোধনের প্রস্তাব করেন এবং পাঠকদের বইটি পড়তে উৎসাহিত করেন।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, শিক্ষাবিদ ও অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামালসহ আরও অনেকে। তারা বইটির গুরুত্ব ও প্রসঙ্গিকতা তুলে ধরেন।


