রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা হত্যার ঘটনায় করা মামলায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। সাক্ষ্য দিয়েছেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা, মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা ও ফুপুসহ ১০ জন।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের উপস্থিতিতে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করেন। ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটের দিকে বিচারক বিরতি দেন।
বাবার সাক্ষ্য
ঘটনার দিনের বর্ণনায় রামিসার বাবা বলেন, ‘আমি সকাল বেলা অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্য বের হই। আনুমানিক সাড়ে ৯টা নাগাদ বের হই বাসা থেকে। ক্যান্টমেন্ট হয়ে বনানীর কাকলীতে যাই। পৌঁছানো মাত্রই ১০টা ১৫ মিনিটে স্ত্রীর ফোন পাই এবং বাসায় চলে আসি। এসে দেখি আমার বাসার সামনে অনেক লোক জড়ো হয়েছেন। তারপর দৌড় দিয়ে আমার ফ্ল্যাটের সামনে যাই। আমার স্ত্রী পারভীন বলেন রামিছা পাশের ফ্ল্যাটে আটকা পড়ে আছে। লোকজন ডাকাডাকি করে সাড়া না পাওয়ায় হাতুড়ি দিয়ে তালা ভাঙার চেষ্টা করে। আমিও দরজার লক ভাঙার চেষ্টা করি। পরে লক ভেঙে দরজা খুলে যায়। এরপর সবাই ভেতরে গিয়ে কমন রুমের দরজা খুলে দেখি শুধু রক্ত আর রক্ত।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখি ২ নম্বর আসামি স্বপ্না খাতুন দাঁড়িয়ে আছেন রক্তের ওপর। তাদের স্টিলের খাট ছিল, সেই খাটের নিচে আমার রামিসার মাথা ছাড়া মরদেহ রাখা ছিল। এরপর আর কিছু মনে নেই। এরপর আমি থানায় গিয়ে এজাহার লিখি আমার মেয়ে হত্যার বিচারের জন্য।’
পরবর্তী প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মাথাটা ছিল বালতির ভেতরে।’
এ সময় আইনজীবী খণ্ডিত মাথার ছবি দেখালে কাঠগড়ায় বসেই কেঁদে ফেলেন রামিসার বাবা।
আসামি পক্ষের আইনজীবী তাকে জেরা করে বলেন, আপনি পুরো ঘটনা নিজের চোখে দেখেছেন কি? উত্তরে তিনি বলেন, না। এরপর জিজ্ঞাসা করেন এই আসামিকে আপনি আগে থেকে চিনতেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি আগে চিনতাম না। কোনো পূর্ব শত্রুতাও ছিল না।’
মায়ের সাক্ষ্য
বেলা ১১টা ২ মিনিটে সাক্ষ্য দিতে কাঠগড়ায় ওঠেন রামিসার মা পারভীন আক্তার।
তিনি বলেন, ‘আমি রান্না করছিলাম। আমার রান্না প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। আনুমানিক ১০টার দিকে আমার বড় মেয়ে রাইসা ও ছোট মেয়ে রামিসা বড় চাচার বাসায় যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। একটু পর আমি রান্নাঘর থেকেই শব্দ পাই। পাশের বাসায় এই লোকেরা থাকে এটা আমি জানতাম না। আমি বারান্দায় তাকিয়ে ছিলাম মেয়েরা কখন আসবে। একটু পর বড় মেয়ে রাইসা আক্তার বাসায় আসে একা। তখন আমি জিজ্ঞাসা করি তুমি একা কেন? রামিসা কোথায়? তখন সে বলে রামিসা তো আমার সঙ্গে যায়নি। তখন আমি নিচে যাই খুঁজতে। আর লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতে থাকি। খোঁজাখুঁজি করার পর না পেয়ে দুই তলায় ও তিন তলায় দরজায় ধাক্কা দিই। তিন তলায় ছিল আসামিদের বাসা। তখন খেয়াল করে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার মেয়ের একটা জুতা। তখনো আমি চিৎকার শুনছিলাম। তখন চারতলা থেকে একটা দম্পতি আসে। এরপর পাশের থেকে আরও লোকজন আসে। এরমধ্যে আমি আমার স্বামীকে ফোন দিতে থাকি।’
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামি স্বপ্না আক্তার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি এই মহিলাকে বারবার বলেছি দরজা খুলে দে, কিন্তু সে দরজা খুলেনি।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনার সময়ে আসামি সোহেলকে আমি দেখিনি। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। পরে শুনি আসামি পালিয়ে গেছে। এই সেই আসামি।’
আসামি পক্ষের আইনজীবীর জেরায় পারভীন বলেন, ‘সিঁড়ি দিয়ে উঠে বামে আমার ফ্ল্যাট। আসামিদের ফ্ল্যাট ডানে। তাদের সাবলেট ভাড়া দেওয়া হয়। তারা এক রুম নিয়ে থাকত। আমার মেয়ের জুতাটা দেখি রুমের দরজার বাইরে।’
মায়ের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে হলে ১১টা ৩০ মিনিটে অন ক্যামেরায় সাক্ষ্য দেন রামিসার বোন রাইসা আক্তার। এ সময় আদালত থেকে সবাইকে বের হওয়ার নির্দেশনা দেন বিচারক। বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে অন ক্যামেরায় তার বোনের সাক্ষ্য শেষ হলে একে একে সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন রামিসার ফুপু মাহমুদা, মিজানুর রহমান লিটন, মনির হোসেন, জাকিরুল ইসলাম রাজু, শেখ আবু শামা, মনিরুজ্জামান শাহীন ও রুমা আক্তার।


