রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি মেটাতে এখন চড়া সুদে ঋণ নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার ইতিমধ্যেই অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে। ফলে এখন সীমিত হয়ে পড়েছে দেশের ভেতর থেকে অর্থসংস্থানের সুযোগ।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা বলছেন, জরুরি ব্যয় মেটাতে সরকার উচ্চ সুদের কঠিন শর্তযুক্ত বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। এসব ঋণের গ্রেস পিরিয়ড বা কিস্তি শুরুর সময়কাল খুব কম এবং দ্রুত তা পরিশোধ করতে হয়। এতে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। কিছু ঋণে অনুদানের অংশ খুবই কম বা নেতিবাচক হওয়ায় তা সহজ শর্তের ঋণের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, দেশ একটি ‘দুষ্টচক্রের’ মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। ঋণের খরচ বৃদ্ধি এবং কিস্তি পরিশোধের চাপ আগামী বছরগুলোতে আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে ২০৩০ সাল নাগাদ ঋণ পরিশোধের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অ-ছাড়মূলক ঋণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভায় ১৯০ কোটি ডলারের পাঁচটি প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬০ কোটি ডলারই উচ্চ সুদের ঋণ। তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ সামলাতে এর বড় অংশ অর্থাৎ ১৩০ কোটি ডলার সরাসরি বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) একটি প্রকল্পের আওতায় ৭৫ কোটি ডলার দেবে। এর মধ্যে ৩০ কোটি ডলার সহজ শর্তে পাওয়া গেলেও ৪৫ কোটি ডলার নিতে হবে চড়া সুদে। এছাড়া জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি ৫০ কোটি, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক ২৫ কোটি এবং ওপেক ফান্ড ১০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা দেবে।
পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়নে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি ডলারের বেশি ঋণের আলোচনা শুরু হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ঋণ শরীয়াহ-ভিত্তিক লিজ মডেলে নেওয়া হবে যার শর্তগুলো অত্যন্ত কঠোর। এতে বাজারভিত্তিক ভাসমান সুদ ব্যবস্থা থাকবে। ছয় মাসের মধ্যে এই চুক্তির সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই ঋণের গ্রেস পিরিয়ড পাঁচ বছর এবং পরিশোধের মেয়াদ ১৫ বছর। তবে নির্মাণ চলাকালীনই প্রতি ছয় মাস অন্তর কিস্তি পরিশোধ শুরু করতে হবে। নির্ধারিত সময়সীমায় কাজ শেষ করতে না পারলে অর্থায়ন বাতিল হতে পারে।
এদিকে আর্থিক চাপ সামলাতে ইআরডির বিভিন্ন শাখা বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। গত সোমবার এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের সঙ্গেও বাজেট সহায়তা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কর্মকর্তারা জানান, চরম আর্থিক চাপের মুখে সরকার ইআরডিকে বিকল্প ঋণের উৎস খুঁজতে বলেছে।
মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সরকার এখন বৈদেশিক ঋণের দিকে বেশি ঝুঁকছে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দেশ এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে রয়েছে। এর মূল কারণ রাজস্ব আদায়ে বিশাল ঘাটতি। প্রতি বছরের মতো এবারও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে, যা খুবই উদ্বেগজনক।
তিনি আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকে সরকার ইতিমধ্যেই লক্ষ্যমাত্রার বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে। অন্যদিকে আইএমএফের শর্ত পূরণে দেরি হওয়ায় বাজেট সহায়তা আটকে আছে। ফলে জ্বালানি ও জরুরি পণ্য আমদানির ব্যয় মেটাতে সরকার আন্তর্জাতিক উৎস থেকে কঠিন শর্তে ও চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
মুজেরী পরামর্শ দেন, ঋণের টাকা অবশ্যই উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করতে হবে যাতে পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হয়। একইসঙ্গে সরকারি ব্যয়ে দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ এবং রাজস্ব নীতিতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। রাজস্ব আদায় বাড়ানোই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র টেকসই পথ।


