পরিচালক তার নির্মাণ ভাবনা পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে অনেক কিছুই করেন। মেজবাউর রহমান সুমনকেও দেখা গেল তার পরবর্তী সিনেমা ‘রইদ’-এর জন্য অন্যরকম একটা পাগলামি করতে।
দৃশ্যের প্রয়োজনে রীতিমত এক বিশাল বন তৈরি করেছেন তিনি। আর এ বনের জন্য লাগিয়েছেন ৫০ হাজার গাছ।
বিশ্ব সিনেমায় না হলেও দেশীয় সিনেমার জন্য এ এক অন্যরকম রেকর্ড।
এসব গাছ লাগাতে ছয় মাস সময় লেগেছে সুমন ও তার দলের। ছবির শুটিং লোকেশন হিসেবে তারা সুনামগঞ্জের মেঘালয়ের কোল ঘেঁষা একটি জায়গা বেছে নিয়েছিলেন। যেখানে লেক, নদী, প্রকৃতি সবই ছিল। কিন্তু বিশাল জায়গা জুড়ে তেমন একটা গাছপালা নেই। অথচ সুমনের লাগবে বনের পাশে এক দম্পতির বাড়ি। যেখানে পার্কের মত সাজানো গোছানোভাবে গাছ থাকবে না, একদমই বনে যেভাবে গাছ থাকে সেভাবেই থাকবে।
সে অনুযায়ী জায়গার মালিকের কাছ থেকে ছয়মাসের জন্য জমি লিজ নেন। স্থানীয় ২৫-৩০ জন সরবরাহকারী প্রতিদিন তিনটি লরিতে করে এসে গাছ লাগিয়েছেন। যার ৭০ শতাংশই সাধারণ বুনো গাছ। বাকি কিছু কড়ই, নারকেল, তাল এ জাতীয় গাছ।
কিন্তু এভাবেই কেন সেট নির্মাণ করতে হবে? চাইলেই কি অন্যভাবে শুটিং করা যেত না?
পরিচালক সুমনের সরাসরি উত্তর, ‘না যেত না। এমনকি ক্রোমাতেও কখনও সম্ভব হতো না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যে গল্পটা বলতে চেয়েছি সেখানে একটা চরিত্র গাছ । এটা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক সেই সম্পর্কের গল্প। সেটার সঙ্গে প্রেম। আদম-হাওয়ার প্রেমের যে আখ্যানের কথা বলছি সেখানে তো প্রকৃতি আছে। কোরআন কিংবা বাইবেলে যে গন্ধম ফলের কথা বলি, সেটা কী ফল?’
‘বিষয়গত জায়গা বা দার্শনিক জায়গা থেকে সেটা তো মানুষের ভেতরে অন্তর্নিহিত মন। তাই ওই প্রকৃতিকে ধরার জন্য যে পরিবেশ লাগত সেটা আগে থেকেই তৈরি করে আমাদের শুটিং করতে হতো, সেটা অন্যভাবে করার কোনো অপশনই ছিল না। প্রয়োজনে ছবিটাই করতাম না।’
গাছ লাগিয়ে গল্পের পরিবেশ তৈরির কারণে ছবিটির শুটিং কয়েক দফা পিছিয়েছেন সুমন। অবশেষে ছবিটির নির্মাণ শেষ হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে এর ট্রেলার।
জানা গেল, বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারড্যাম’ (আইএফএফআর)-এর ৫৫তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগ ‘টাইগার কম্পিটিশন’-এ নির্বাচিত হয়েছে ছবিটি।
উৎসবে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশি ছবি প্রদর্শিত হলেও মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে এ প্রথম স্থান পেল বাংলাদেশের কোনো ছবি। ক্রিস্টোফার নোলান ও বং জুন-হো’র মতো বিশ্বখ্যাত নির্মাতাদের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের ছবি এই বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছিল।
২০২০ সাল থেকে ‘রইদ’-এর চিত্রনাট্যের কাজ করছিলেন সুমন।
তিনি জানালেন, এ ছবির গল্পের সাদু ও সাদুর পাগলি বউয়ের সঙ্গে তার শৈশব থেকেই যোগাযোগ। সাদুর কোলে করে গ্রামের মেলায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার মায়ের মুখে শুনেছেন সাদুর জীবনের গল্প।
সুমন বলেন, ‘সাদু এতিম, তার বড় হয়ে ওঠা আমার নানাবাড়িতেই। সাদু একজন সংসার বিমুখ, নিঃসঙ্গ লোক। সাদু কিভাবে বুড়ো হয়েছিল, কিংবা তার মৃত্যুর স্মৃতি আমার মনে নেই। স্মৃতিতে সাদু আটকে আছে কেবল আমার শৈশবেই। আর বাকিটা মায়ের মুখে শোনা সাদুর পরাবাস্তব জীবন। আমি কেবল ভাবতে চেয়েছি এরপর সাদুর জীবনে কী হয়েছিল, আর এই ভাবনার অপর নাম “রইদ”।’
সাদুর স্ত্রী চরিত্রে দেখা যাবে নাজিফা তুষিকে আর সাদু হিসেবে মোস্তাফিজুর নূর ইমরানকে। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন গাজী রাকায়েত, আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ প্রমুখ।
গল্প যৌথভাবে লিখেছেন মেজবাউর রহমান সুমন ও সেলিনা বানু মনি। চিত্রনাট্যে সুমনের সঙ্গে কাজ করেছেন জাহিন ফারুক আমিন, সিদ্দিক আহমেদ এবং সুকর্ণ শাহেদ ধীমান।
‘হাওয়া’-র পর সুমনের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘রইদ’ নির্মিত হয়েছে বঙ্গবিডির প্রযোজনায়। সহ-প্রযোজনায় রয়েছে ফেসকার্ড। সুমন জানালেন, তার ছবিটি রটারডামে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের পরপরই দেশে মুক্তির পরিকল্পনা।


