অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা স্ট্রিমের’ কর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের আত্মহত্যার ‘কারণ স্পষ্ট’ জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ।
ময়নাতদন্ত, ডিএনএ, ভিসেরা রিপোর্ট এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা চিরকুট বিশ্লেষণ করে তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বর্ণময়ী যৌন নিপীড়নের শিকার হননি, বরং পরিবারের সঙ্গে ‘গভীর অভিমান’ থেকে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।
গত ১৪ এপ্রিল ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
তদন্ত ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সোবহানবাগের বাসা থেকে ২৮ বছর বয়সী স্বর্ণময়ীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গলায় ফাঁস নেওয়ায় শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও তদন্তে তার প্রমাণ মেলেনি।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সাইফুল বলেন, ‘আমরা একটি চিরকুট পেয়েছি। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ বা প্ররোচনার দাবি না থাকায় এবং আত্মহত্যার কারণ স্পষ্ট হওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।’
ঘটনার দিন যা ঘটেছিল পুলিশি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বর্ণময়ী তার বড় ভাই সৌরভ বিশ্বাস ও বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন। গত ২৫ সেপ্টেম্বর তার বাবা-মা গ্রামের বাড়ি যান।
ঘটনার দিন সকালে স্বর্ণময়ী ‘অস্বাভাবিক আচরণ’ করলে তার ভাই বাবা-মাকে ঢাকা ফেরার কথা বলেন, কিন্তু স্বর্ণময়ী তাদের ফিরতে নিষেধ করেন।
সেদিন সকালে স্বর্ণময়ী নিজের কক্ষে ব্লেড দিয়ে বাম হাতের কনুইয়ের একাধিক জায়গায় ক্ষত করেন। বিকালে জেঠিমা ও তার ছেলে বাসায় এলে স্বর্ণময়ী রক্তাক্ত হাত কাপড় দিয়ে ঢেকে তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক গল্প করেন।
একপর্যায়ে জেঠিমা তার পোশাকে রক্তের দাগ দেখে ফেললে স্বর্ণময়ী কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেন এবং ওড়না দিয়ে সিলিং ফ্যানে ফাঁস নেন। পরে ভাই সৌরভ দরজা খুলে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার একটি রক্তমাখা ব্লেড, প্রিন্টের ওড়না, নোটবুক ও ডায়েরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নোটবুকের দ্বিতীয় পাতায় স্বর্ণময়ীর নিজের লেখা একটি চিরকুট পাওয়া যায়।
চিরকুটে স্বর্ণময়ী লিখেছেন, ‘সবাই এটাই ভাবছে, আমার হতে এটা আশা করেনি। মজার ব্যাপার হলো, আমি নিজেও আশা করিনি। কী লিখব বুঝতে পারছি না। মাথার মধ্যে শুধু অভিমান। আর অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর নেই কারও কাছে। চলে যাওয়ার প্ল্যান করেছি অনেক দিন আগে। মাঝে দাদাভাইয়ের বিয়ে বেঁধে গেল। এত বাধার মধ্যে আমি বাধা হতে চাইলাম না। তাই শেষবারের মতো তোমাদের একটু গুছিয়ে দিয়ে গেলাম।’
তিনি আরও লেখেন, ‘মা দাদাভাই (বড় ভাই সৌরভ বিশ্বাস) ছাড়া কোনো দিন কিছু চিনলই না। মা আমার মুখের ওপরই বলে, তোমাকে নিয়ে আমি ভাবি না। আমার ছেলেকে নিয়ে যত চিন্তা।… মায়ের জগতে তার ছেলে বাপি আর মানুষ। ওই জগতে আমি কোথাও ছিলাম না। ছিলাম শুধু দায়িত্ব হয়ে। সবার দায়িত্ব।’
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা গোপনে ও প্রকাশ্যে সার্বিক তদন্ত শেষে এবং ভিসেরা ও ডিএনএ রিপোর্ট পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এটি গভীর অভিমান থেকে করা একটি আত্মহত্যা। তদন্তের ফলাফল স্বর্ণময়ীর পরিবারকে জানানো হলে তাদের কোনো সন্দেহ না থাকায় পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে


