রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারে বাজার করতে এসে দেখা হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী রফিক উদ্দিনের সঙ্গে। পণ্যের বাড়তি দামে তার চক্ষু চড়কগাছ। বলছিলেন, ‘আগে একবারে পুরো মাসের বাজার করতাম। এখন একবারে বাজার করার সামর্থ্য নেই। মাসে কয়েকবার আসি। কিন্তু কয়েকবার মিলেও আগের তুলনায় অনেক কম কেনাকাটা হয়।’
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে টানা চার বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দৈনন্দিন খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ, কিন্ত তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় বাড়েনি। সংসারের ব্যয় সমন্বয় করতে তাই বাজারের ফর্দ ছোট করতে বাধ্য হয়েছেন রফিক। বাদ দিতে হয়েছে ছোট বড় অসংখ্য শখ-আহ্লাদ।
জীবনযাপনের এই হিসাব সরল মনে হলেও বাস্তবতা নির্মম। মূল্যস্ফীতির হার বিবেচনায় দেখা যায়, ২০২২ সালে যেখানে খরচ ১০০ টাকা ছিল, ২০২৬ সালে এসে তা হয়ে গেছে ১৪০ টাকা।
বাড়তি এই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধি হয়নি। কাগজে কলমে চার বছরে বেড়েছে মুজুরি বেড়েছে কেবল ৩৩ শতাংশ। তবে এই হিসাবও মেলাতে পারেন না রফিক।
তিনি জানান, মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খরচ ঠিকই বেড়েছে, কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় বাড়েনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিভিন্ন প্রতিবেদনে সীমিত আয়ের মানুষদের অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এই কয় বছরে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের গতিতেও পড়েছে ছেদ।
মজুরির চেয়ে বেশি হারে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি
বাংলাদেশে ২০২২ সালের মে মাস থেকে মজুরি বৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতির নিচে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। সংস্থার ওয়েজ রেট ইন্ডেক্স (ডব্লিউআরআই) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সময়ে প্রকৃত মজুরি ঋণাত্মক থেকে গেছে, অর্থাৎ আয়ের চেয়ে ব্যয় দ্রুত বেড়েছে।
২০২১ অর্থবছরে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সে সময় প্রকৃত আয় সামান্য ইতিবাচক থাকলেও ২০২২ থেকে পরিস্থিতি উল্টে যায়। সে বছর মজুরি বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ১২ শতাংশ হলেও মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১৫ শতাংশে।
এই ব্যবধান আরও বাড়ে, যখন একই বছর বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি দ্রুত ৭ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠে যায়, অথচ বিপরীতে ডব্লিউআরআই ছিল ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
২০২৩ এ মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির ব্যবধান দাঁড়ায় ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ পয়েন্ট এবং ২০২৪ এ তা ১ দশমিক ৯৯ শতাংশ পয়েন্টে নেমে আসে, যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং মজুরি বৃদ্ধি ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা যায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায় এবং মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ; ব্যবধান ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ পয়েন্ট।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসের তথ্যানুযায়ী, মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। ফলে প্রকৃত মজুরি এখনও ০ দশমিক ৮৮ শতাংশ পয়েন্ট ঋণাত্মক রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চেয়ে গড় মজুরি যখন কম বাড়ছে তখন নির্দিষ্ট অংকের বেতনের ওপর চলা মানুষরা সংসার চালাতে অপ্রয়োজনীয় খরচ ছেঁটে ফেলার পাশাপাশি সন্তানের পেছনে ব্যয়, শখ আহ্লাদ সবই বাদ দিচ্ছেন। এমনকি পুষ্টিকর খাবারও কম খাওয়ার কথা বলছেন অনেকে। এতে শিশুদের মধ্যে পুষ্টির ঘাটতির আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
শিশুর প্লেট থেকে সরে যাচ্ছে পুষ্টিকর খাবার
উত্তর বাড্ডার বাজারে এসেছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রোজিনা বেগম। তিনি জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হিসাবের সঙ্গে তার আয়ের হিসাব মেলাতে পারেন না। জানান, গত দুই বছরেও তার বেতন বাড়েনি।
সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ার পর শখ আহ্লাদ বাদ দিয়ে শেষে এখন নিরুপায় হয়ে ৭ বছরের ছেলের খাবার কমাতে বাধ্য হয়েছেন। মা হিসেবে এটা মেনে নিতে পারেন না তিনি।
‘ছেলে যখন ছোট ছিল, তখন ভিটামিনসমৃদ্ধ সবজি, মাংস আর দুধ নিয়মিত খাওয়াতে পারতাম। যে হারে দাম বাড়ছে, সেই পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার আর কিনতে পারি না’, আক্ষেপ করতে থাকেন তিনি।
রোজিনা জানালেন, আগে যেখানে দুই কেজি মাংস কিনতেন, এখন সেটা নেমে এসেছে এক কেজিতে। দুধের দামও বেড়েছে।
আরও কয়েক অভিভাবক জানান, তারাও সন্তানদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে ধীরে ধীরে মাছ, মাংস, ফল ও দুধ কমিয়ে দিচ্ছেন।
বাদ পড়ছে শখ আহ্লাদ
যশোরের খালিদ ইসলাম মিজান টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, তিনি প্রায় দুই বছর ধরে বাড়ি যান না। ঢাকায় যে আয় হয় তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালানো ও বাড়িতে অতিরিক্ত টাকা পাঠানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘যতটুকু পারি, ঢাকা থেকে যে ইনকাম হয় তা দিয়েই বাসায় টাকা পাঠাই’, বলেন তিনি।
তিনি জানান, বাড়ি গেলে শুধু আসা-যাওয়ার পরিবহন খরচই প্রায় দুই হাজার টাকা। এর সঙ্গে স্ত্রী-সন্তানের ভাড়া, আবার বাড়ি গিয়ে যৌথ পরিবারের জন্য বাজার খরচ, সব মিলিয়ে বড় অঙ্কের টাকা লাগে।
এই আর্থিক চাপের কারণে গত দুই বছর চার ঈদেও বাড়ি যেতে পারেননি বলে জানান খালিদ।
এভাবেই কেউ ঘুরতে যাওয়ার খরচ কমিয়েছে, কেউ সন্তানকে বাইরে খাওয়ানোর আবদার বাতিল করছেন। তালিকা যেন ফুরায় না।
‘পেনশনে আর কুলায় না’
মেরাদিয়া কাঁচাবাজারে বাজার করতে এসেছিলেন ৬৭ বছর বয়সী সেলিম হোসেন। সরকারি চাকরি করতেন এক সময়। এখন সংসার চলে তার পেনশনের টাকায়। এই বয়সে অতিরিক্ত আয়ের আর কোনো সুযোগই নেই তার।
ছেলে-মেয়েরা আলাদা সংসার করছেন। তিনি থাকেন স্ত্রীকে নিয়ে।
সেলিম হোসেন বলেন, ‘আগে যে পেনশনের টাকা পেতাম, এখনও সেই টাকাই পাচ্ছি। কিন্তু ক্রয়ক্ষমতা কি আগের মতো আছে? আগে যে টাকায় মাস চলত, এখন সেই টাকায় কয়েকদিনও ঠিকমতো চলে না।’
বয়স বেড়ে যাওয়ায় খরচ তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন খাত। সেটি হলো ওষুধ আর ডাক্তারের ফি। দিনকে দিন এই খরচও বেড়ে যাচ্ছে। সামনে কী হবে, সেই দুর্ভাবনায় শরীর যেন আরও খারাপ করে তার।
তিনি বলেন, ‘সব ধরনের পণ্যের দামই তো গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আমার মতো সীমিত আয়ের প্রবীণদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন।’
বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী টাইমসকে বলেন, ‘নিম্নআয়ের শ্রমিকরা বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেও স্থির আয়ের মধ্যবিত্তরা সেই সক্ষমতা হারাচ্ছেন।’
যাদের আয় দারিদ্র্যসীমার সামান্য উপরে ছিল, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। এই গোষ্ঠী দারিদ্রসীমার কাচকাছি অবস্থান করলেও ধীরে ধীরে প্রকৃত দরিদ্র শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে।
নতুন করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব গৃহীতি হলে মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে, সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
অর্থনীতির এই শিক্ষক বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতির পেছনে বৈশ্বিক প্রভাব থাকলেও অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতাই বেশি দায়ী।’
‘আর্থিক ও রাজস্ব খাতের ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিয়েছে’, যোগ করেন শাহাদাত হোসেন।
থমকে গেছে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি
দারিদ্র্য বিমোচনে ২০২০ সালেও বাংলাদেশের নাম বিশ্বের কাছে ছিল উজ্জ্বল উদাহরণ। তবে গত চার বছরে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। ২০২২ সাল থেকে টানা তৃতীয় বছরের মতো দারিদ্র্যের হার বেড়েছে।
সরকারি হিসাবে ২০২২ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। এই তিন বছরে নতুন করে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যে পড়েছে। ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে আনুমানিক তিন কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট (এপ্রিল ২০২৬) আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত বাড়ার আগে ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ বাংলাদেশি দারিদ্র্যসীমার (দৈনিক ৩ ডলার) উপরে উঠে আসার কথা ছিল। এখন সেই সংখ্যা ৫ লাখে নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার সুযোগ হারিয়েছে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যেভাবে জ্বালানি সংকটের প্রভাব দ্রুত খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিতে ছড়িয়ে পড়েছিল, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের আংশিক প্রভাব একইভাবে আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতিতে আরও প্রায় ০ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট যোগ করতে পারে।
অধ্যাপক সিদ্দিকী বলেন, ‘টানা কয়েক বছরের মূল্যস্ফীতির চাপে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসের স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক অনুমানও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দারিদ্র্য এখন কমার পরিবর্তে আবার বাড়ছে।’
করণীয় কী
শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকীর মতে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে একক কোনো সমাধান নেই; বরং মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনা এই তিন স্তরে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রথমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি কার্যকর হলে সুদের হার, টাকা সরবরাহ ও আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে অতিরিক্ত তারল্য কমানো সম্ভব। অবশ্য এতেও সরাসরি খাদ্যপণ্যের দাম কমে না।
দ্বিতীয়ত, সরকারের রাজস্বনীতিতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে কৃষি, অবকাঠামো ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মতো উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়ানো দরকার, যাতে দীর্ঘমেয়াদে দামের চাপ কমে।
তৃতীয়ত, সরবরাহ ও বাজার কাঠামো সংস্কার জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরাসরি সরবরাহ ব্যবস্থা, কার্যকর বাজার মনিটরিং এবং পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করলে মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমতে পারে।
চতুর্থত, শ্রমবাজারে মজুরি যদি মূল্যস্ফীতির নিচে থাকে, তাহলে প্রকৃত আয় কমতেই থাকবে। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরি সমন্বয় এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।


