মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের নামে দল বেঁধে ‘মাদক বিক্রেতা’ আখ্যা দিয়ে মানুষকে সাজা দেওয়ার প্রবণতা এখন বাড়িঘরে হামলায় গিয়ে ঠেকেছে। কিশোরগঞ্জে একই দিন ১২টি বাড়িতে হামলা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ভিডিও ছড়িয়েছে।
মাদকের অভিযোগকে কেন্দ্র করে কেবল এক সপ্তাহে ২১টি জেলায় এমন অন্তত ৬৮টি মব সহিংসতার ভিডিও খুঁজে পাওয়া গেছে।
সর্বোচ্চ ৩২টি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। রাজশাহী বিভাগে ৯টি, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে আটটি করে, ময়মনসিংহে ছয়টি, বরিশাল ও রংপুর বিভাগে দুটি করে এবং সিলেট বিভাগে একটি ঘটনা ঘটেছে।
শুরুর দিকে মানুষকে দল বেঁধে হেনস্থা ও পেটানো এবং মিছিলের ভিডিওগুলো বেশি আসত। ধীরে ধীরে আরও বেশি সহিংস হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
যারা এসব ঘটনায় জড়িত, তাদের মধ্যে একটি ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাদকবিরোধী অবস্থানের কথা প্রচার করেছেন।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিজানুর রহমান খান এই ধরনের প্রবণতা নিয়ে সতর্ক করেছেন। টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা বা প্রতিহিংসা থেকেও কাউকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হতে পারে। ফেসবুকে কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে অন্যরা সেটি অনুসরণ করতে চায়। ফলে একটি সহিংস সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।’
সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সমাজকে রক্ষার কথা বলে অনেকে এই ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিলেও তা ফৌজদারি অপরাধ হয়ে যায় বলেও সতর্ক করেন এই ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ। বলেন, ‘মবের সঙ্গে যুক্ত অনেকে বুঝতেই পারেন না যে, এ ধরনের সহিংসতায় অংশ নেওয়াও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।’
বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা
ঘটনাটি ফরিদপুরের। মাথার ওপর এখনো ছাদ পুরোপুরি তৈরি হয়নি। ইট-সিমেন্টের গাঁথুনি শেষ করে ছাদ ঢালাইয়ের প্রস্তুতি চলছিল। এরই মধ্যে হাতে হাতুড়ি, শাবল আর লাঠি নিয়ে কয়েকজন মানুষ নির্মাণাধীন সেই বাড়িতে হামলে পড়ে। মুহূর্তেই ভাঙচুর শুরু হয়।
ছড়ানো ভিডিওতে এক যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘মাদকের টাকায় নির্মিত বাড়ি এই এলাকায় থাকবে না।’ হামলাকারীদের অভিযোগ, স্বামী-স্ত্রী মাদক বিক্রি করে বাড়িটি নির্মাণ করেছেন। অভিযুক্তদের কাউকে না পেয়ে তাদের নির্মাণাধীন বাড়িটিই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন এলাকাবাসী।
গত ২০ জুন কিশোরগঞ্জের যশোদল ইউনিয়নের মধ্যপাড়া সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় জুমার নামাজের পরে একদল মানুষ এভাবে ১২টি বাড়িতে অভিযান চালায়। একাধিক বাড়িতে ভাঙচুরের পর ধরিয়ে দেওয়া হয় আগুন। হামলাকারীরা একই সঙ্গে উচ্ছ্বাস এবং গর্ব করছিলেন।
সেদিন শেরপুর সদর উপজেলার বয়ড়া গ্রামেরও একটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় ‘মাদকবিরোধী জনতা’। তাদের বাধায় আগুন নেভাতে গিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয় ফায়ার সার্ভিস। ভুক্তভোগী পরিবারটি এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
আর কী কী শাস্তি
জুন মাসের শুরুর দিকে ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ভোলার সাধারণ মানুষ দলবদ্ধ হয়ে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের বাড়িঘর ঘেরাও বা ভাঙচুর করা শুরু করে। অনেক জায়গায় মাদক বিক্রেতাদের হাতেনাতে ধরে গণপিটুনি দিয়ে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এরপরই এটা সারাদেশে ছড়িয়ে যায়।
ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শাস্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি দেওয়া হচ্ছে পিটুনি। মিছিল নিয়ে সন্দেহভাজনদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে আটক করা হয়। এরপর কখনো গাছে বেঁধে মারধর করা হয়, কোথাও কান ধরে ওঠবস করানো হয়, কোথাও নাকে খৎ দিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ানো হয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও তার পরিবারের সদস্য বা সম্পত্তিকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
বেশিরভাগ ঘটনাতেই স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ নিয়ে গেলেও তারা অল্প সময়ের মধ্যেই কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে আবার একই কারবারে জড়িয়ে পড়েন। ফলে অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আইনগত প্রক্রিয়ায় স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
মিজানুর রহমান খান টাইমসকে বলেন, ‘পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যদি কার্যকর ভূমিকা পালন করত, তাহলে এ ধরনের মব সহিংসতার সৃষ্টি হতো না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ টাইমসকে বলেন, ‘মাদকসংক্রান্ত মামলায় অভিযুক্তরা সহজেই জামিন বা ছাড়া পেয়ে যায়। এতে মানুষের মধ্যে এমন ধারণা জন্মায় যে, এ ধরনের অপরাধের জন্য শাস্তির ঝুঁকি কম, যা পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়তে উৎসাহিত করে।’
পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতি মানুষের অনাস্থা এর একটি কারণ বলে মনে করেন মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামও।
তিনি বলেন, ‘মানুষের ধারণা, প্রশাসনের একটি অংশের সঙ্গে মাদক কারবারিদের যোগসাজশ রয়েছে। সরকারের চাপ থাকলে কিছু সময় অভিযান চালানো হয়, কিন্তু পরে আবার একই ব্যক্তিরা মুক্ত হয়ে আগের কার্যক্রমে ফিরে যায়।’
বিপদ কোথায়
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সমাজের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুমাইয়া ইকবাল। তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে নিজেরাই বিচার করতে শুরু করে, তখন তা ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দেয়। সাধারণ মানুষের হাতে শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতা ছেড়ে দিলে তা সমাজের কোনো উপকার করে না।’
‘মব সহিংসতা স্বভাবগতভাবেই অনিয়ন্ত্রিত। এতে ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত—উভয়েরই সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে,’ বলেন তিনি।
মবের শুরু কবে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, থানায় হামলা এবং প্রশাসনিক শূন্যতার কারণে মানুষের একটি অংশ দ্রুত বিচারের বিকল্প হিসেবে জনতার বিচারকে বেছে নিতে শুরু করে।
সময়ের সঙ্গে সেই প্রবণতা আরও বিস্তৃত হয়ে এখন মাদক কারবারি, চুরি, ছিনতাই কিংবা ব্যক্তিগত অভিযোগের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘মবের দিন শেষ।’ কিন্তু সরকার এসব বিষয়ে কঠোর, এমন কোনো ইঙ্গিত মেলেনি।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মব সহিংসতায় অন্তত ১৭৪ জন নিহত হয়েছে।
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিচারহীনতার হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত আইনের শাসনকেই দুর্বল করে। মবের হাতে বিচার চলে গেলে অপরাধী ও নিরপরাধের মধ্যে পার্থক্য করার সুযোগ থাকে না, আর ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা গুজবও সহজেই সহিংসতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।’
‘নির্দেশদাতা’ সংসদ সদস্যরাও
মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের ডাকের পাশাপাশি কিছু রাজনৈতিক নেতার কঠোর বক্তব্যও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ব্রাহ্মণকান্দা গ্রামে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে মানুষকে যারা সাজা দিচ্ছেন, তারা ভিডিওতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা শহিদুল ইসলাম বাবুলের নির্দেশের কথা বলেছেন।
সংসদ সদস্য বাবুল টাইমসকে বলেন, ‘মাদককে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। কিন্তু এর মানে এই না যে কারো বাড়িঘর ভেঙে ফেলবে বা কাউকে মারধর করবে। এই ধরনের কোনো নির্দেশ আমি দেইনি।’
মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘যেখানে মাদক ব্যবসায়ী পাবেন, তাকে সেখানেই এলাকা থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করবেন। যদি জেল থেকে এসে এলাকায় থাকতে চায়, তাকে থাকতে দেবেন না। যদি থাকে, তাহলে আমি বুঝব এলাকার সব দুর্বল মানুষ।’
হবিগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস এম ফয়সলের মতে, মাদক নির্মূলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে চলবে না; শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা ও সচেতন নাগরিকদের নিয়ে শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
সমাধান কোথায়?
প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং সবার ক্ষেত্রে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে মানুষের আস্থা ফিরবে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী ইজাজুল ইসলাম।
তার মতে, পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি, কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা এবং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার প্রসার প্রয়োজন।
মাদক সমস্যার সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও জড়িত বলে উল্লেখ করেন সুমাইয়া ইকবাল। তিনি বলেন, ‘আর্থিক সংকটের কারণে অনেকেই মাদক কারবারিতে জড়িয়ে পড়েন।’
পুনর্বাসনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের অর্থনৈতিকভাবে পুনঃএকীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পুনর্বাসনের সুযোগ না দিলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন।’


