মাগুরার একমাত্র ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া হাজরাপুরী লিচু বাজারে আসতে শুরু করেছে। এ বছর মৌসুমের শুরুতেই লিচু পাড়া শুরু হওয়ায় চাষিরা বেশ ভালো দাম পাচ্ছেন। ক্রেতাদের প্রবল আগ্রহ আর বাড়তি আয়ের সুযোগে স্থানীয় চাষিদের মুখে এখন হাসির ঝিলিক।
স্বাদে অনন্য এই লিচু মিষ্টি ও হালকা টক স্বাদের জন্য পরিচিত। অনুকূল আবহাওয়া এবং লিচু বাগানের উন্নত ব্যবস্থাপনার কারণে এ বছর উৎপাদন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। মাগুরা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় চলতি বছর মোট ৬৩৯ হেক্টর জমিতে হাজরাপুরী, মোজাফফরী, চায়না-৩ এবং বোম্বাই জাতের লিচুর চাষ হয়েছে।
মাগুরা সদর উপজেলার হাজরাপুর ও এর আশেপাশের গ্রামগুলোতে এখন লিচু পাড়ার ধুম লেগেছে। বাগানের গাছগুলো লালচে রঙের লিচুর থোকায় ভরে উঠেছে। স্থানীয় চাষি ও শ্রমিকরা সকাল থেকেই লিচু সংগ্রহ, বাছাই এবং তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
স্থানীয় চাষিদের দাবি, প্রায় ৫০টি গ্রামের বাসিন্দাদের প্রধান অর্থকরী ফসল এখন এই হাজরাপুরী লিচু। অনেক পরিবার তাদের সারা বছরের সংসার খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতের বিনিয়োগের জন্য এই মৌসুমি আয়ের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে।
নরহাটি গ্রামের লিচু চাষি আব্দুল জলিল জানান, আগে তারা ধান ও অন্যান্য ফসলের ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু এখন হাজরাপুরী লিচু তাদের ভালো দাম দিচ্ছে, জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। প্রতি বছর লিচুর আয় দিয়েই পরিবারের বড় বড় সব খরচ সামাল দেন বলে জানান আব্দুল জলিল।
লিচুর এই ভরা মৌসুমে জেলায় কর্মসংস্থানও বেড়েছে। পূর্ণিমা রানী ও মোমিনুল ইসলামের মতো দিনমজুররা জানান, তারা দিনে দুই বেলা বিভিন্ন বাগানে কাজ করেন। লিচু পাড়া, গ্রেডিং এবং প্যাকেজিংয়ের কাজ করে তারা বাড়তি টাকা আয় করছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকা ও অন্যান্য জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন খুব ভোরে হাজরাপুরে আসছেন। সরাসরি বাগান থেকেই লিচু কিনে নিচ্ছেন তারা। এ বছর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আগেই বাজারে লিচু আসায় চাষিরা বেশ লাভজনক দাম পাচ্ছেন।
মাগুরা হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. শাহিনুজ্জামান বলেন, হাজরাপুরী লিচু দেশের অন্য অঞ্চলের লিচুর চেয়ে আগেই বাজারে আসে। এর টক-মিষ্টির চমৎকার মিশ্রণ ক্রেতাদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। স্থানীয় এই জাতটি চাষ করে কৃষকরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি এটি তাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখছে।
মো. শাহিনুজ্জামান আরও জানান, অনুকূল আবহাওয়া এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতির সমন্বয়ে এবার বেশ ভাল ফলন হয়েছে। সঠিক ব্র্যান্ডিং এবং বাজারের বিস্তৃতি ঘটাতে পারলে ভবিষ্যতে হাজরাপুরী লিচু বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই লিচু কেবল স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, বরং দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে মাগুরার নিজস্ব পরিচয়।


