পৃথিবীর গভীর সমুদ্র থেকে শুরু করে এভারেস্টের চূড়া প্লাস্টিক দূষণের চিহ্ন এখন প্রায় সর্বত্র। এমনকি মানুষের শরীরেও মিলেছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি। এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাই পরিচিত মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে।
পরিবেশ দূষণ নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু এই ক্ষুদ্র কণাগুলো আসলে কী, কোথা থেকে আসে এবং কেন এগুলো নিয়ে বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন?
মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংজ্ঞা নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও বহুল ব্যবহৃত একটি সংজ্ঞা অনুযায়ী, ১ ন্যানোমিটার থেকে ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত আকারের যেকোনো প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। আকারে এগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র। একটি ন্যানোমিটার মানুষের চুলের প্রস্থের তুলনায় অতি সামান্য অংশ, আর ৫ মিলিমিটার প্রায় একটি আংটির প্রস্থের সমান। অধিকাংশ কণাই খালি চোখে দেখা যায় না।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ইকোসিস্টেমস বিভাগের পরিচালক সুসান গার্ডনারের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রধানত দুটি উৎস রয়েছে। প্রথমটি হলো প্রাথমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক। এগুলো শুরু থেকেই ক্ষুদ্র আকারে তৈরি করা হয়। যেমন, কসমেটিকস ও ফেসওয়াশে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র দানা বা মাইক্রোবিড।
দ্বিতীয়টি হলো গৌণ মাইক্রোপ্লাস্টিক। বড় প্লাস্টিক পণ্য ধীরে ধীরে ভেঙে এসব ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। প্লাস্টিকের মোড়ক, খাবারের পাত্র, পলিয়েস্টার কাপড়, গাড়ির টায়ার, রং এবং কৃত্রিম ঘাস থেকে এ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পানি, মাটি ও বাতাসে পাওয়া যাচ্ছে। এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে প্রায় ২৭ লাখ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে।
ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক পণ্য সময়ের সঙ্গে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। পানির বোতল, প্লাস্টিক মোড়ক বা অন্যান্য প্যাকেজিং সামগ্রী এভাবেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস হয়ে ওঠে। এছাড়া পলিয়েস্টারের মতো সিনথেটিক কাপড় ধোয়ার সময় ক্ষুদ্র প্লাস্টিক ফাইবার ছড়িয়ে দিতে পারে। মাইক্রোপ্লাস্টিকযুক্ত বিভিন্ন পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমেও এসব কণা পরিবেশে ছড়ায়।
একবার পরিবেশে প্রবেশ করলে এগুলো সহজে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে প্রাণী ও মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এগুলো মাটি, পানি, বরফ এমনকি বাতাসের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গার্ডনার জানান, ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে কোথায় গিয়ে জমা হয়, তা আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। তবে আমরা নিশ্চিত যে পরিবেশে থাকা এসব কণা খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশ করে।’
খাদ্যশৃঙ্খল থেকেই মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে। খাবার গ্রহণ , দৈনন্দিন ব্যবহার্য এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেও। এক মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট ন্যানোপ্লাস্টিক ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে কি না, তা নিয়েও গবেষণা চলছে।
২০১৯ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়, স্থান ও জীবনযাপনের ধরন অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ৩৯ হাজার থেকে ৫২ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন।
গত এক দশকে বিজ্ঞানীরা মানুষের মস্তিষ্ক, রক্ত, হৃদ্রোগতন্ত্র, যকৃত, কিডনি, পাকস্থলী, ফুসফুস, অণ্ডকোষ, এমনকি গর্ভফুল (প্লাসেন্টা) পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন। তবে এসব কণা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
২০২৪ সালে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ক্যারোটিড ধমনির প্লাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মেগান উলফ বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে এবং হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু মানুষের জন্য নয়, উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের জন্যও উদ্বেগের কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কণা সামুদ্রিক অণুজীব ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের বিস্তারে বাধা তৈরি করতে পারে। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মাটির উর্বরতা কমিয়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে।
কিছু গবেষণায় এমনও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মেরু অঞ্চলের বরফ ও তুষার গলনের গতি বাড়াতে পারে। এতে পৃথিবীর সূর্যালোক প্রতিফলনের ক্ষমতা কমে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কমাতে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করা। সুসান গার্ডনারের মতে, কোম্পানিগুলোকে পণ্যে অপ্রয়োজনীয় মাইক্রোপ্লাস্টিক যোগ করা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি এমন পণ্য তৈরি করতে হবে, যেগুলোতে কম প্লাস্টিক ব্যবহার হয় এবং ব্যবহারের সময় কম প্লাস্টিক ফাইবার ছড়ায়।
এছাড়া উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এতে প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমবে এবং তা ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হওয়া ঠেকানো যাবে। মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু পরিবেশ দূষণের বিষয় নয়; এটি মানবস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ।


