ভোলার মেঘনা নদীর ভাঙন রোধে তীর সংরক্ষণের জন্য ৭২১ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, যেখানে ব্যয়ের প্রস্তাব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পটিতে নদীতীর সংরক্ষণে প্রতি মিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রের মতে, এই ব্যয় সমজাতীয় অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় অস্বাভাবিক রকমের বেশি।
ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার বিভিন্ন এলাকাকে মেঘনার ভাঙন থেকে বাঁচাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০২৬ সাল থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী, মাত্র ৪ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ৫০৫ কোটি ৪৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটার তীর সংরক্ষণে খরচ হবে ১২৬ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া ৬ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন ও ঢাল সংরক্ষণে ১৭৯ কোটি ৯৩ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর ফলে এই খাতে প্রতি মিটারের ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। পাশাপাশি দুটি নিকাশ কাঠামো নির্মাণের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৩ কোটি ৯২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।
প্রকল্পের প্রশাসনিক খাতের প্রস্তাবিত ব্যয়ও নজর কেড়েছে সংশ্লিষ্টদের। এতে ১৬০ সিসির একটি মোটরযান কেনার জন্য ৩ লাখ টাকা এবং চারটি যানবাহন মেরামত ও সংরক্ষণে ১০ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। প্রচার ও বিজ্ঞাপনে ৫ লাখ টাকা, পরিবেশ ছাড়পত্র গ্রহণে ৯ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ৩২টি কম্পিউটার সামগ্রী কিনতে ৫ লাখ টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া কর্মকর্তাদের সম্মানী বাবদ ৩৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা, জরিপ কাজে ১৩ লাখ টাকা এবং ১ হাজার ৪৪১ বার ভ্রমণের জন্য ১০ লাখ টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। জ্বালানি তেল ও লুব্রিকেন্ট বাবদ ২০ লাখ এবং মুদ্রণ ও বাঁধাই খাতে আরও ৫ লাখ টাকা সংস্থান রাখা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সমজাতীয় প্রকল্পগুলোতে সাধারণত প্রতি মিটারে খরচ হয় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। উদাহরণ হিসেবে তারা জানান, বরিশালের বাবুগঞ্জে সুগন্ধা নদীর ভাঙন রোধ প্রকল্পে মিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে ৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা। এমনকি ভোলাতেই চলমান অন্য একটি প্রকল্পে এত বেশি টাকা ব্যয় হচ্ছে না।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায়ই প্রকল্পগুলোতে গাড়ি কেনাসহ বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় খাতে উচ্চ ব্যয় প্রস্তাব করে থাকে। এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট কাঠামো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয় বাজেট ও বরাদ্দ সীমার মধ্যে নেতিবাচক ঘাটতি রয়েছে। এই বিশাল ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, সে বিষয়েও মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
এই প্রকল্পের ব্যয় যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসেন খান জানান, কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে প্রস্তাব এলে কমিশন সেটি কয়েক ধাপে যাচাই করে। কোনো খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় থাকলে তা বাতিল করা হয় অথবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে এবং ব্যয় বেশি মনে হলে তা যৌক্তিকভাবে কমানোর নির্দেশ দেওয়া হবে।
ব্যয়ের এই বিশাল পার্থক্যের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট শাখার সহকারী প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নদীভাঙনের মাত্রা এবং কাজের ধরনের ওপর ভিত্তি করে ব্যয়ের তারতম্য হয়। যেখানে স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করতে হয়, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই খরচ বাড়ে। নদীর গভীরতা ও ভাঙনের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নকশা তৈরি করা হয় এবং সেই অনুযায়ী ব্যয়ের হিসাব করা হয়। প্রকল্পটি ভোলা অফিস তৈরি করায় ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ তারাই ভালো বলতে পারবে।
এ প্রসঙ্গে ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়া উদ্দীন আরিফ জানান, ব্যয়ের বিষয়ে ইতিমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, প্রকল্প এলাকার নদীর গভীরতা প্রায় ৩৩ মিটার এবং ডাম্পিং ভলিউম ৯৫ মিটার, যা অন্য জায়গার তুলনায় অনেক বেশি। ডাম্পিং ভলিউম বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্লকের স্থায়িত্ব বা স্ট্রেন্থও বাড়ানো হয়েছে। এসব কারণেই মূলত প্রকল্পে ব্যয় বেশি ধরা হয়েছে।


