বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। বন্য প্রাণীর চলাচলের স্পর্শকাতর করিডোর দিয়ে প্রস্তাবিত এই ‘ইকোনমিক লাইফলাইন’ বা অর্থনৈতিক প্রাণরেখা প্রকল্পটি থমকে গেছে ক্রমবর্ধমান ব্যয়, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে। এক দিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অন্য দিকে পরিবেশ সংরক্ষণ—দুইয়ের টানাপোড়েনে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো প্রকল্পটি।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), বন বিভাগ এবং জাপানের সরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে জমা দেওয়া সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনটি পর্যালোচনার কাজ চলছে, যা শেষ হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। ফলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) তৈরি করা এই প্রতিবেদনটি এখন পুনর্মূল্যায়ন করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সড়ক)। আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রকল্পের বিপুল ব্যয়ভার সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। অন্য দিকে, পরিবেশ রক্ষা কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থানে অনড়। পরিকল্পনায় বন্য প্রাণী সংরক্ষণের যে সুরক্ষা কবচ রাখা হয়েছে, তাতে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার বিষয়ে তারা সতর্ক করে দিয়েছে।
চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাহিদ হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, জাইকার প্রতিবেদনের বিস্তারিত প্রস্তাবগুলো এখন একটি বিশেষ কমিটি পর্যালোচনা করছে। তিনি বলেন, ‘এই প্রতিবেদনটিকে আমরা ভিত্তি হিসেবে ধরেছি। আমরা ব্যয়, সংযোগ এবং পরিবেশগত প্রভাবসহ সব দিক খতিয়ে দেখছি। মূল্যায়ন শেষ হলে আমরা জাইকার সঙ্গে চুক্তির দিকে এগোব।’
পতেঙ্গার শাহ আমানত সেতু থেকে ফাসিয়াখালী পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার সড়কের জন্য ৪৭ হাজার কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্যাকেজ প্রস্তাব করেছে জাইকা। এটি বাস্তবায়ন হলে তা হবে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সড়ক প্রকল্প। এই উচ্চ ব্যয়ের প্রধান কারণ হলো এর পরিবেশবান্ধব নকশা, যেখানে পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত। ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যানবাহন এখানে চলাচল করে। ট্রাফিক ও নিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মহাসড়কটি দিনে ১২ থেকে ১৫ হাজার যানবাহন চলাচলের উপযোগী হলেও বর্তমানে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। অতিরিক্ত চাপের কারণে বেশ কিছু এলাকা দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে। এতে যানজট ও বিলম্বের পাশাপাশি যাত্রী, পণ্যবাহী পরিবহন, পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি চরমভাবে বেড়ে গেছে।
প্রস্তাবিত মহাসড়কের প্রায় ৬০ শতাংশ অংশ হবে ‘এলিভেটেড’ বা উড়ালপথ। এর মূল লক্ষ্য হলো বিপন্ন এশিয়ান হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর যারা চুনতি ও ফাসিয়াখালী অভয়ারণ্যে যাতায়াত করে তাদের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা। এই পরিকল্পনার আওতায় কেবল ১০ কিলোমিটারের একটি অংশ নির্মাণেই ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা।
তবে এই বিশাল আর্থিক বোঝা সরকারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই মহাসড়কের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৭২৩ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের অন্যান্য বড় প্রকল্পের তুলনায় অনেক বেশি। তুলনামূলকভাবে, ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২০১ কোটি টাকা।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে, প্রকল্পের আন্তর্জাতিক মান এবং পরিবেশগত সংবেদনশীলতা প্রশংসনীয়। তবে এত ব্যয়বহুল মডেল টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে তারা সন্দিহান। জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এটি বিশ্বমানের একটি নকশা, কিন্তু আর্থিক দিক থেকে আমাদের জন্য তা বহন করা অত্যন্ত কঠিন।’ ব্যয় কমাতে উড়ালপথের অংশ কমিয়ে আনার কোনো সুযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখাই এখন পর্যালোচনার প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি জানান।
তবে বন বিভাগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আপসের কোনো সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নূর জাহান বলেন, ‘পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকায় বিকল্প কোনো নকশা গ্রহণযোগ্য হবে না। বন্য প্রাণীর নিরবচ্ছিন্ন চলাচল নিশ্চিত করতে এবং আবাসস্থল যেন বিচ্ছিন্ন না হয়, সে জন্য উড়াল কাঠামো অপরিহার্য। অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি আমরা করতে পারি না।’
তিনি সতর্ক করে বলেন যে, অপরিকল্পিত সড়ক ও রেল প্রকল্পের কারণে ইতিমধ্যে হাতির চলাচলের পথ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, যা মানুষ ও বন্য প্রাণীর দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে দিয়েছে এবং প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। ৬০ শতাংশ উড়াল কাঠামোর প্রস্তাবটি ‘ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা’ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রস্তাবিত রুটটি বন্যাপ্রবণ বনভূমি ও জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে। সেখানে প্রাকৃতিক পানির প্রবাহ এবং বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উড়াল কাঠামো এই ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
এদিকে, দিন দিন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছেই। বর্তমানে ১৪৬ কিলোমিটারের এই মহাসড়কটি এখনো দুই লেনের ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক হিসেবেই রয়ে গেছে, যা দীর্ঘ যানজট এবং ঘন ঘন দুর্ঘটনার জন্য পরিচিত। এটিকে দেশের অন্যতম ‘মরণফাঁদ’ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর চালু হলে পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ আরও বাড়বে। তাই চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং দেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্রের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে চার লেনের এই আধুনিক মহাসড়ক এখন সময়ের দাবি।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের দুই প্রান্তের প্রায় আট কিলোমিটার অংশ ইতিমধ্যে প্রশস্ত করা হয়েছে। এছাড়া ২৩ কিলোমিটার বাইপাস সড়ক এবং কেরানীহাটে একটি ওভারপাস নির্মাণের কাজ দ্রুতই শুরু হতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, ফাসিয়াখালী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার অংশ জাইকার বর্তমান প্রস্তাবনার বাইরে রাখা হয়েছে।


