পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদীর কাছের খালে জমেছে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের আবর্জনার স্তূপ। খালের প্রবেশমুখে ভাসমান বর্জ্য অপসারণের জন্য স্থাপন করা যন্ত্রটিও দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে আছে। ফলে পানিতে জমে থাকা ময়লা সরানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
খালের মুখে স্থাপিত বর্জ্য ছাঁকনি যন্ত্রটির পাশেই ঝুলে আছে একটি বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ বাক্স। এর ঢাকনা ক্ষয়ে গেছে, ভেতরের তারগুলোও উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। যন্ত্রপাতির এমন জরাজীর্ণ দশা নগরের অবশিষ্ট জলপথগুলো পরিষ্কার রাখার উদ্যোগের বড় একটি দুর্বলতা সামনে এনেছে। যন্ত্র স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়, সেগুলো সচল রাখাও যে সমানভাবে জরুরি, ফরাশগঞ্জের খালটি তারই উদাহরণ।
এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, এই ভোগান্তি নিত্যদিনের। ময়লায় ভরা খাল থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। জমে থাকা আবর্জনার আশপাশে ভিড় করছে মশা, মাছি ও অন্য পোকামাকড়।
বর্জ্য অপসারণ যন্ত্রটি অচল হয়ে পড়ায় ঢাকার পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো এবং নগরের খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ফরাশগঞ্জ পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক নগর এলাকার অংশ। কয়েক দশকের দূষণ, দখল ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে এখানকার জলপথগুলো ধীরে ধীরে তাদের স্বাভাবিক রূপ হারিয়েছে।
একসময় ঢাকার ঐতিহাসিক খালগুলোর মধ্যে অন্যতম ধোলাই খাল নৌপথে যোগাযোগ ও পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে খালটির বিভিন্ন অংশ সংকুচিত হয়েছে, ভরাট করা হয়েছে কিংবা বিস্তৃত নগর এলাকার মধ্যে হারিয়ে গেছে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এই খালের করুণ পরিণতি জলপথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বৃহত্তর সংকটেরই প্রতিফলন।
নালা ও পানি নিষ্কাশনের পথগুলোতে ফেলা বর্জ্য খালের প্রবেশমুখসহ বিভিন্ন স্থানে জমে নিষ্কাশন ও আবর্জনা অপসারণের জন্য তৈরি অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এই সমস্যা মোকাবিলায় পানির ওপর ভাসমান বর্জ্য সংগ্রহ করে নিষ্কাশনব্যবস্থার অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর জন্য বর্জ্য ছাঁকনি যন্ত্র স্থাপন করা হয়। কিন্তু এসব যন্ত্রও নষ্ট হয়ে গেলে সেগুলোর মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

ফরাশগঞ্জের যন্ত্রটি অচল থাকায় খালের পানিতে আবর্জনা জমে থাকছে। একই সঙ্গে আশপাশের পরিবেশেরও অবনতি হচ্ছে।
সমস্যাটি শুধু খালের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্গন্ধে এলাকাটি বসবাস ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। মশা-মাছিসহ বিভিন্ন পোকামাকড়ের উপদ্রবও বাসিন্দাদের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পচনশীল জৈব বর্জ্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে প্লাস্টিক ও সহজে পচে না এমন বর্জ্য পানিদূষণ বাড়ায়।

পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং বর্জ্য অপসারণের যন্ত্র স্থাপন দৃশ্যমান দূষণ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সময়মতো মেরামতের ওপর। যে যন্ত্র দিনের পর দিন অচল পড়ে থাকে, সেটি স্থাপনের উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে না।
এদিকে খালে ময়লা জমতেই থাকে। এতে পরবর্তী সময়ে পরিষ্কার করার কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এই খালের অবস্থা কেবল একটি নষ্ট যন্ত্র কিংবা জলপথের নির্দিষ্ট একটি অংশের সমস্যা নয়। ঢাকার অবশিষ্ট খালগুলো বর্জ্য ফেলা, দখল এবং ক্রমবর্ধমান নগর জনসংখ্যার চাহিদা – সব মিলিয়ে একাধিক চাপের মুখে রয়েছে। এগুলো সচল ও ব্যবহারোপযোগী রাখতে মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করার অভিযান যথেষ্ট নয়।

জলপথগুলো রক্ষা করতে হলে শুধু জমে থাকা আবর্জনা সরালেই চলবে না। খাল পরিষ্কার রাখার জন্য যেসব ব্যবস্থা ও যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো যেন অবহেলায় অচল হয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ময়লায় আটকে থাকা খালটি সাধারণ মানুষের প্রয়োজন আর সেই প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর মধ্যে বিশাল ব্যবধানের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। যন্ত্রটি পড়ে আছে অচল, বাসিন্দারা ভুগছেন এর পরিণতিতে, আর বুড়িগঙ্গার প্রাণপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত জলপথগুলো আবর্জনা ও অবহেলায় ক্রমেই আটকে যাচ্ছে।


