তামিলনাড়ুর রাজনীতির তপ্ত প্রান্তরে এখন কেবলই রূপালি পর্দার এক সেনাপতির জয়গান। তামিল সিনেমার চিরচেনা ‘থালাপতি’ বিজয় এখন কেবল আর রুপালি পর্দার রোমান্টিক বা অ্যাকশন হিরো নন, তিনি এখন তামিলনাড়ুর মসনদের দাবিদার। তার নবগঠিত দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম’ (টিভিকে) যে অভাবনীয় এবং একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে চলেছে, তা দ্রাবিড় রাজনীতির দীর্ঘ অর্ধশতকের প্রথাকে চুরমার করে দিয়েছে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে রূপালি পর্দার তারকাদের দাপট নতুন কিছু নয়। তামিল সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা জনপ্রিয় অভিনেতা মারুদুর গোপালান রামচন্দ্রন (এমজিআর) থেকে জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়ললিতা—পর্দার নায়ক-নায়িকারা বারবারই সেখানকার মসনদ দখল করেছেন। অভিনয় জগত থেকে এসে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন এমজিআর, তার হাত ধরে রাজনীতিতে এসে সবচেয়ে বেশি সময় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জয়ললিতা। মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘আম্মা’।
তামিলনাড়ুর রুক্ষ লাল মাটি কয়েক দশক ধরে দেখেছে কেবল দুই দানবীয় শক্তির আধিপত্য। ১৯৬৭ সালে কংগ্রেসের পতন ঘটিয়ে যে দ্রাবিড় আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, গত ৫০ বছর ধরে তা আবর্তিত হয়েছে দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজাগাম (ডিএমকে) এবং অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজাগাম (এআইএডিএমকে)—এই দুই মেরুকে কেন্দ্র করে। একদিকে মুথুভেল করুণানিধির সুযোগ্য উত্তরসূরি এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনের ডিএমকে, অন্যদিকে এমজিআর ও জয়ললিতার উত্তরসূরি এডাপ্পাদি কে পালানিস্বামীর এআইএডিএমকে। তবে এবারের নির্বাচনে এই দুই মহীরুহের পায়ের তলা থেকে মাটি কেড়ে নিয়েছেন বিজয়। ‘থালাপতি’ অর্থাৎ সেনাপতি নামের সার্থকতা বজায় রেখে তিনি একাই লড়েছেন প্রতিষ্ঠিত এই দুই জোটের বিরুদ্ধে।
বিজয়ের এই উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এক সুনিপুণ রাজনৈতিক রণকৌশল। তিনি যখন ২০২৪ সালে তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) গঠনের ঘোষণা দেন, তখন থেকেই তিনি তার বিশাল ফ্যান ক্লাব ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’কে সুশৃঙ্খল এক রাজনৈতিক বাহিনীতে রূপান্তর করেন।
তার এই জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ভোটারদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। এম কে স্টালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে সরকারের বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্র আর দুর্নীতির যে অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে, বিজয় তাকেই করেছেন তার তূপের তাস। অন্যদিকে, জয়ললিতার প্রয়াণের পর এডাপ্পাদি কে পালানিস্বামীর নেতৃত্বাধীন এআইএডিএমকে চরম নেতৃত্ব সংকটে ভুগছিল, যা বিজয়ের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যস্থান তৈরি করে দেয়।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি বিশেষ দিক হলো ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির চরম ভরাডুবি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশে বিজেপি তামিলনাড়ুতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শিকড় গড়তে মরিয়া ছিল। তারা এআইএডিএমকে-র সঙ্গে জোট বেঁধে লড়ে কে আন্নামালাইয়ের নেতৃত্বে মেরুকরণের রাজনীতিকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বর্ণপ্রথা বিরোধী ইভি রামাস্বামী পেরিয়ার এবং দ্রাবিড় জাতীয়তাবাদ উত্থানের নায়ক আন্নাদুরাইয়ের প্রগতিশীল ভাবাদর্শে পুষ্ট তামিলনাড়ুর মানুষ বরাবরই সাম্প্রদায়িকতার সেই বিষবাষ্পকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিজয়ের ‘টিভিকে’ যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও তামিল ‘অস্মিতা’কে (জাতীয়তাবাদ) গুরুত্ব দিয়েছে, সেখানে বিজেপি-এআইএডিএমকে জোটের সাম্প্রদায়িক সুর ধোপে টেকেনি। বিজয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রমাণ করেছেন যে, তামিলনাড়ুর মাটি কেবল সম্প্রীতির, সেখানে ধর্মীয় মেরুকরণের কোনো স্থান নেই।
বিজয়ের এই জয়যাত্রা প্রমাণ করেছে যে, তিনি কেবল অভিনেতা হিসেবে নন, একজন সার্থক জননেতা হিসেবেও জনগণের হৃদয় জয় করেছেন। তার প্রতিটি জনসভায় যখন তিনি ঘোষণা করেছেন, “আমি পর্দার রাজা হতে আসিনি, আমি আপনাদের সেবক হতে এসেছি”—তখন সেই আবেগী সুর ছুঁয়ে গেছে লাখ লাখ যুবককে। চিরাচরিত বড় কোনো দলের সঙ্গে জোট না করে একক শক্তিতে লড়ে তিনি যে সাফল্য দেখিয়েছেন, তা ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। ভোটাররা এখন কেবল প্রকল্পের চাল বা বিনামূল্যে দেওয়া ল্যাপটপ নয়, তারা ক্ষমতার স্বচ্ছতা এবং তারুণ্যের তেজ খুঁজছিল—বিজয় ঠিক সেই ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
পর্দার ‘থালাপতি’ আজ বাস্তবের সেনাপতি হয়ে তামিলনাড়ুর শাসনভার হাতে নিতে চলেছেন। তবে রূপালি পর্দার স্ক্রিপ্ট আর রাজ্য পরিচালনার স্ক্রিপ্ট এক নয়। এম কে স্টালিনের মতো ঝানু রাজনীতিকের বিরোধী অবস্থান আর কেন্দ্রের ক্রমাগত রাজনৈতিক চাপের মুখে বিজয় কীভাবে তার রাজ্য পরিচালনা করেন, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
আপাতত ভারতের এই দক্ষিণী রাজ্যটি এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়, যেখানে সিনেমার নায়কই হয়ে উঠেছেন রাজনীতির মহানায়ক। এই জয় কেবল বিজয়ের নয়, এই জয় নতুন এক রাজনৈতিক দর্শনের।


