বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈধভাবে মানুষ ও পণ্য চলাচল নিশ্চিত করতে একটি অত্যন্ত উন্নত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের সাবেক কূটনীতিক পঙ্কজ সরন।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিহতের ঘটনাগুলোকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি এই আহ্বান জানান।
দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাটস্ট্র্যাট’-এর কনভেনর পঙ্কজ সরন সম্প্রতি নয়াদিল্লির সুষমা স্বরাজ ইনস্টিটিউট অব ফরেন সার্ভিসে বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন।
সীমান্তের অবৈধ অর্থনীতি ও চ্যালেঞ্জ
পঙ্কজ সরন বলেন, ‘সীমান্তে যা ঘটছে তা দুর্ভাগ্যজনক। এমনটা মোটেও হওয়া উচিত নয়। কেন এমন হচ্ছে তা নিয়ে আমাদের নিজেদের কাছে সৎ হতে হবে। এর প্রতিকার বাংলাদেশ ও ভারত উভয় পক্ষের কর্তৃপক্ষের হাতেই রয়েছে।
সাবেক এই হাইকমিশনার উল্লেখ করেন, সীমান্ত কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সরকারের মধ্যে অনেক প্রটোকল এবং চুক্তি সই হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাস্তব সত্য হলো সীমান্তের অর্থনীতির একটি বড় অংশই অবৈধ, যা দুর্ভাগ্যজনক। এটি চোরাচালান, অস্ত্র ও অপরাধের একটি বিপজ্জনক সংমিশ্রণ তৈরি করে, যেখানে সাধারণ মানুষও জড়িয়ে পড়ে।’
প্রযুক্তি ও সহযোগিতার গুরুত্ব
নেপাল, ভুটান ও রাশিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই বিশেষজ্ঞ জানান, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা সমাধানের প্রথম ধাপ।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সেই পুরোনো অতীতে ফিরে যাওয়া চলবে না যেখানে দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে সন্দেহের সম্পর্ক ছিল। সেটি কোনো সমাধান আনবে না। বর্তমানে তাদের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করার এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা রয়েছে।’
তিনি সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় উন্নত প্রযুক্তি, যোগাযোগ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
সীমান্ত হত্যার পরিসংখ্যান
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে অন্তত ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনে মারা গেছেন। এ বছর মে মাস পর্যন্ত বিএসএফের হাতে অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বর্তমানে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাঁটাতারের বেড়া, সীমানা পিলার পরিদর্শন এবং নদী সীমান্ত চিহ্নিতকরণের মতো কাজগুলো সক্রিয়ভাবে চলছে। মাদক পাচার, জাল মুদ্রা ও মানবপাচার রোধে দুই দেশের বিভিন্ন সংস্থা ও ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি) পর্যায়ের বৈঠক নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
উগ্রবাদ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
এক প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ সরন বলেন, উগ্রবাদী আদর্শ বা সন্ত্রাসী সংগঠন যাতে কোনো সুযোগ না পায়, সে জন্য দুই দেশকে মিলেমিশে কাজ করতে হবে।
বিশেষ করে মিয়ানমার পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানকার অস্থিতিশীলতা ভারত ও বাংলাদেশ–উভয় দেশের জন্যই হুমকি।
গোয়েন্দা তৎপরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা থাকে যাদের কাজ রাষ্ট্রকে রক্ষা করা। এমনকি যুদ্ধাবস্থা না থাকলে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান ও সহযোগিতার একটি সংস্কৃতি থাকে।
তিনি আরও যোগ করেন, অনেক সময় ভারতের শত্রুপক্ষ বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করে, যা নিয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
পঙ্কজ সরন পরিশেষে বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে গভীর বোঝাপড়া রয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে সহায়ক।


