প্রভাবশালীদের দখলে মাগুরার ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী রামসাগর খাল

প্রভাবশালীদের দখলে মাগুরার ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী রামসাগর খাল
রামসাগর খাল। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় দখল হয়ে যাচ্ছে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদরের প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী রামসাগর খাল। খালের সরকারি জমি দখল করে নির্মাণ করা হচ্ছে বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এতে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমে উপজেলা সদরের একাধিক বিল ও বাওড়ে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

এলাকাবাসী জানান, মধুমতি নদী থেকে ঘোপ বাওড় হয়ে মহম্মদপুর উপজেলা সদর অতিক্রম করে কাতলাশুরি বিলে গিয়ে মিশেছে ঐতিহাসিক রামসাগর খাল। স্থানীয়দের মতে, প্রায় চারশ বছর আগে মোঘল আমলে স্বাধীনচেতা রাজা সীতারাম রায় মহম্মদপুরে রাজবাড়ি নির্মাণের সময় রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি সেচব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে মধুমতি নদী থেকে কাতলাশুরি বিল পর্যন্ত এই খাল খনন করেন। দীর্ঘদিন ধরে খালটি কৃষকের জীবন-জীবিকার অন্যতম সহায়ক হিসেবে পরিচিত ছিল।

সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত রামসাগর খাল বর্তমানে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। উপজেলা সদরের কাতলাশুরি বিলসহ অন্তত পাঁচটি বিলের প্রায় ১০ হাজার একর কৃষিজমিতে বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির জোগান দিতে এই খাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বর্তমানে উপজেলার বাওইজানি এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইস গেট সংলগ্ন অংশসহ বিভিন্ন স্থানে খালের দুই পাড় দখল করা হয়েছে। কোথাও কোথাও খালের বুকজুড়ে পাকা স্থাপনাও নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে পানি চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মমিন উদ্দিন আহমেদসহ একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সামনেই খাল দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাদের দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা অর্থের বিনিময়ে দখলদারদের সুযোগ করে দিচ্ছেন। এর ফলে একের পর এক পাকা ভবন নির্মিত হচ্ছে এবং খালের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট তৈরি হচ্ছে।

আরও পড়ুন

এ ব্যাপারে মহম্মদপুরের সাংবাদিক ও পরিবেশ কর্মী সালাউদ্দিন আহমেদ মিল্টন আক্ষেপ করে জানান, সম্প্রতি খাল খনন কর্মসূচির দুই কোটি ২০ লাখ টাকা খরচ করতে না পেরে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার। অথচ তার চোখের সামনেই রামসাগরের খালটি দখল ও দূষণে ধুকে ধুকে মরছে। বাজারের সব আবর্জনা খালে ফেলে এই জলাশয়ের শ্বাসরোধ করা হচ্ছে। অন্যদিকে জায়গায় জায়গায় বাড়িগুলোর পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপ খালে ফেলে পরিবেশ দূষন চলছেই। এটি স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতার এক উজ্জল দৃষ্টান্ত।

স্থানীয় বাসিন্দা মাসুমা পারভীন, স্মৃতি বেগমসহ অনেকেই খাল দখলের প্রতিবাদ জানিয়ে দ্রুত খাল দখলমুক্ত ও পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, প্রভাবশালীদের মদতে অনেকেই খালের জমিতে অবৈধভাবে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। অথচ উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রি জানান, খাল দখল ও দূষণ বিষয়ে এলাকাবাসী কোনো অভিযোগ আমার কাছে জানায়নি । বিষয়টি অবগত হলাম। আমি এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেব।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড, মাগুরার নির্বাহী প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান খাল দখলের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘খাল দখলকারীদের ইতোমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতায় দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। দখলমুক্ত করার পরই খাল পুনঃখননের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকেও খাল দখলমুক্ত করার দাবিতে আমাদের কাছে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad