ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনা ও আনুষ্ঠানিকতার পর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব।
বৃহস্পতিবার ভোর থেকে বিজয়া দশমীর বিহিত পূজা সম্পন্ন করে ভক্তরা দেবীর চরণে অঞ্জলি ও শান্তির জল ছিটিয়ে দর্পণ বিসর্জন করেন। রাজধানীসহ দেশের নদী ও পুকুরে চলে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন।
উৎসবের সূচনা হয়েছিল আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে বেলতলায় আনন্দময়ীর নিদ্রাভঙ্গের বন্দনায়। নবমী পূজা শেষে দেবী দুর্গা মর্ত্য ছেড়ে নিজালয়ে যাত্রা করেন এবং দশমীতে দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূর্ণ হয় দুর্গোৎসবের আয়োজন।

দুর্গার বিসর্জন উপলক্ষে ভক্তদের মধ্যে বিষাদের ছায়া লক্ষ্য করা গেছে। এদিন বিকালে রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে হাজার হাজার ভক্ত উপস্থিত হন। পল্টন বদির স্কুলের আয়োজিত মণ্ডপ থেকে বিকাল ৩টায় বুড়িগঙ্গার ওয়াইজ ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়। ভক্তরা দেবীর চরণে অঞ্জলি দিয়ে বিজয়ার প্রার্থনা করেন, এরপর শোভাযাত্রা করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় বিসর্জনস্থলে। ঢাকঢোল, উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয় পরিবেশ।
চট্টগ্রামে প্রতিবছরের মতো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত বিসর্জনের প্রধান কেন্দ্র। কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট, অভয়মিত্র ঘাট ও বিভিন্ন পুকুরেও প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। দুপুরের পর ট্রাকে করে দেবী দুর্গার প্রতিমা পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে নেওয়া হয়। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে বিসর্জন দেখতে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও অন্যান্য ধর্মের মানুষও উপস্থিত ছিলেন।
রাজশাহীতে নগর সিটি করপোরেশন ও পূজা উদযাপন কমিটির আয়োজনে পদ্মা নদীর তিনটি ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের ব্যবস্থা করা হয়। বিকাল ৪টায় নগরের মণ্ডপ থেকে শোভাযাত্রা করে ঘাটে প্রতিমা নেওয়া হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও বিশেষ বাহিনী, পাশাপাশি নদীতে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উপস্থিত থাকেন।
সিলেট, সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহেও যথাযথ নিরাপত্তার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন হয়। ময়মনসিংহে দশমীর দিনে ভক্তরা নেচে-গেয়ে, সিঁদুর খেলে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান।

সারা দেশের মতো রাজধানীতে ২৫৪টি মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন হয় বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদীর ১০টি ঘাটে। বিনাস্মৃতি স্নান, ওয়াইজ ও নবাববাড়ি ঘাটে সবচেয়ে বেশি প্রতিমা বিসর্জন হয়। এ ছাড়া লালকুটি, মিলব্যারাক, পোস্তগোলা শ্মশান, বসিলা ব্রিজ, আমিনবাজার ও আশুলিয়ার ধউরে বিআইডব্লিউটিসি ফেরিঘাটেও বিসর্জনের আয়োজন করা হয়েছে।
বিসর্জন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবির সাত হাজার সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। নদীতে নৌ-দুর্ঘটনা রোধে টহল দিচ্ছে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের মনের আসুরিক প্রবৃত্তি–কাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসা–বিসর্জন দেওয়াই বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এসব প্রবৃত্তি দূর করে ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার বিদায় হলেও ভক্তদের মনে থাকে আগামী বছরের পুনরাগমনের আশা। বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর আরও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদযাপন হয়েছে।


