ইট-পাথর আর ব্যস্ত সময়ের যাঁতাকলে পিষ্ট নাগরিক জীবনে একটু স্বস্তির খোঁজ করেন না এমন মানুষ কমই আছেন। সেই কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তি আর ছায়া সুনিবিড় সবুজে প্রাণের সান্নিধ্য পেতে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার সিংড়া শালবন হতে পারে প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য।
উত্তরবঙ্গে ঢাকা-পঞ্চগড় মহাসড়ক থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার ভেতরে ঢুকলেই এক মায়াবী অরণ্য জানান দেয়, প্রকৃতি আজও তার সবটুকু সৌন্দর্য উজাড় করে দিতে কার্পণ্য করেনি।
৮৫৯ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বনটি এখন শুধু গাছপালার সমারোহ নয়, বরং জীববৈচিত্র্যের এক বিশাল আধার। ১৮৮৫ সালে অধিভুক্ত হওয়া এই বনটি ২০১০ সালে জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা পায়।
স্থানীয়রা একে ভালোবেসে ‘সিংড়া শালবন’ বলে থাকেন। শ্রাবণের বৃষ্টি আর শরতের রোদে এই বনের রূপ পাল্টায় প্রতি ক্ষণে। শাল, সেগুন, আর জারুলের ফাঁকে যখন সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ে, তখন মনে হয় যেন এক টুকরো সুন্দরবন গড়ে উঠেছে দিনাজপুরের মাটিতে।
সিংড়া বনের গভীরে গেলে চোখে পড়ে প্রকৃতির এক বিচিত্র বিস্ময় গিলা লতা। পাটের দড়ির মতো ঝুলে থাকা এই লতা দেখলে যে কেউ ক্ষণিকের জন্য টারজানের অরণ্যে হারিয়ে যাবেন। বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি বনের ভেতর ছড়িয়ে আছে হাজারো উইয়ের ঢিবি, যা উচ্চতায় একেকটি ছয় থেকে সাত ফুট পর্যন্ত। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো প্রাচীন ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে আছে।
বনের গভীরে সৌন্দর্যের ঝলকানি যেমন রয়েছে, তেমনি আছে বিপন্ন প্রাণীর জীবন রক্ষার লড়াই। এই বনেই রয়েছে প্রকৃতির ‘ঝাড়ুদার’ হিসেবে পরিচিত বিলুপ্তপ্রায় শকুন। সিংড়া বন বিভাগ এই দুর্লভ পাখিদের বাঁচাতে গড়ে তুলেছে বিশেষ পুনর্বাসন কেন্দ্র। শীতকালে বিপদগ্রস্ত শকুনদের সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলা হয় এবং বসন্তের শুরুতে তাদের আবার নীল আকাশে অবমুক্ত করা হয় যা বনের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার এক অনন্য নজির।
সিংড়া বনের এক প্রান্তে ৬০ থেকে ৭০টি আদিবাসী পরিবারের বসবাস, যাদের অধিকাংশ সাঁওতাল। তারা বনের গাছপালা আর পশুপাখির সঙ্গেই গড়ে তুলেছে নিবিড় মিতালি।
অবাক করা বিষয় হলো, এই মানুষগুলোই এখন বনের অতন্দ্র প্রহরী। বন বিভাগের সাথে মিলে নয়টি রক্ষা কমিটির মাধ্যমে তারা বনের সম্পদ পাহারা দিচ্ছে। বন থেকে সংগ্রহ করা খাদ্য আর ভেষজ উদ্ভিদেই তাদের জীবন চলে, অথচ বনের ক্ষতি তারা হতে দেয় না। এই মানবিক সহাবস্থানই সিংড়া বনকে প্রাণবন্ত রেখেছে।
বনের ভেতর দিয়ে সর্পিল গতিতে বয়ে চলা নর্ত নদ এই অরণ্যের সৌন্দর্যকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। টাঙ্গন থেকে আসা এই নদের স্বচ্ছ পানি আর তার ওপরের ছোট ব্রিজটি পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণের জায়গা।
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের স্মৃতিতে বাঘ কিংবা নীলগাইয়ের বিচরণ থাকলেও, বর্তমান প্রজন্মের কাছে এগুলো নিছকই গল্প মাত্র। তবে এই প্রজন্মের কাছেও এ বনটি খরগোশ, শিয়াল আর অসংখ্য পাখির কলকাকলিতে ঘেরা এক নিরাপদ স্বর্গ।
পিকনিক স্পট, শিশুদের খেলার অনুষঙ্গ আর সরকারি রেস্টহাউস মিলিয়ে সিংড়া বন এখন পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র। ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন কিংবা বিমানে সৈয়দপুর হয়ে সহজেই পৌঁছানো যায় এই সবুজের রাজ্যে।
প্রকৃতি আর মানুষের সুন্দর মেলবন্ধনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ সিংড়া শালবন। ব্যস্ততার যান্ত্রিকতা ভুলে যারা একটু শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ আর বন্যপ্রাণের সান্নিধ্য খুঁজছেন, সিংড়া বন তাদের দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে।


