পুরান ঢাকা আর যানজট, শব্দ দুটি যেন একাকার। যান চলাচলে বিশৃঙ্খলা, সড়ক দখল করে দোকান, ফুটপাতে দোকানের সামগ্রী ফেলে রেখে যাতায়াতে বিঘ্ন, লাখ লাখ মানুষের ভোগান্তির অবসানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না দেখে হতাশ এলাকাবাসী।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ন্ত্রিত ক্যামেরা ঢাকার বিশৃঙ্খল যান চলাচলে কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনছে, কিন্তু পুরান ঢাকাবাসী এখানেও আশাবাদী হতে পারছে না।
সদরঘাট, চকবাজার, বংশাল, সূত্রাপুর, নবাবপুর ও বাংলাবাজার এলাকায় চলাচলের প্রধান বাহনই মূলত রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। ট্রাফিক আইন মানতে চালকদের যেমন আগ্রহ নেই, তেমনি তাদের ধারণাও নেই সেভাবে। এসব যানের ডিজিটাল নিবন্ধন বা নম্বরপ্লেট নেই। ফলে আইন ভঙ্গ করলেও তাদের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা করা সম্ভব নয়।
বিস্তীর্ণ এই এলাকা হয়ে উঠেছে বাণিজ্যকেন্দ্রও। সেগুলোও পরিকল্পনা করে করা হয়নি। আর এতে ঘিঞ্জি হয়ে গেছে গোটা এলাকা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য ছোট কারখানা, রাসায়নিক গুদাম। এতে মালামাল পরিবহনের জন্য ছোটবড় গাড়ির ভিড় লেগেই থাকে। এমনিতেই সরু হয়ে যাওয়া সড়ক দখল করে রাখায় দীর্ঘ যানজট তৈরি হয় প্রতি কর্মদিবসে।
রায়সাহেববাজার এলাকার বাসিন্দা আবদুস সালাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘রিকশা ও অটোরিকশা প্রায়ই উল্টো পথে চলাচল করে কিংবা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করায়। এতে যানজট আরও বাড়ে।’
এই বাস্তবতায় ঢাকার বাকি অংশে ট্রাফিক পুলিশ এআই ক্যামেরার ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় মামলা করে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজে অনেকটাই সফল হচ্ছে।
নগরীর আটটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। আগামী ছয় মাসে এ সংখ্যা ৬০ এবং এক বছরের মধ্যে ১২০টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব ক্যামেরা যানবাহনের নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড করছে। পরে বিআরটিএর ডাটাবেজ থেকে মালিকের তথ্য সংগ্রহ করে ডিজিটাল মামলা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪০০টির বেশি ঘটনায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে।
পুরান ঢাকার রায়সাহেববাজার এলাকার ব্যবসায়ী আবু তাহেরের আক্ষেপ, এই পরিকল্পনায় পুরান ঢাকাকে রাখা হয়নি। অবশ্য এআই ক্যামেরা সেখানে কতটা সফল হবে তা নিয়ে তার প্রশ্নও আছে।
তিনি বলেন, ‘পুরান ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা রিকশা ও অটোরিকশা। সেগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে এই প্রযুক্তির সুফল সীমিত হবে।’
পুরান ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেন, ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এমন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে টাইমসকে বলেন, ‘এআই ক্যামেরার মাধ্যমে রিকশা শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়ার প্রযুক্তিগত সুযোগ নেই। ফলে পুরান ঢাকার মতো এলাকায়, যেখানে রিকশার সংখ্যা অনেক বেশি, সেখানে এআইভিত্তিক নজরদারির কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।’
তাহলে ঢাকার এই অংশের মানুষ কি প্রযুক্তির সুবিধা পাবে না?- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘চালকদের জীবিকার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শুরুতেই কঠোর পদক্ষেপের বদলে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মাইকিং করে চালকদের নিয়ম মেনে চলতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’
শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান টাইমসকে বলেন, পুরান ঢাকার যানজট সমস্যার সমাধান শুধু এআই ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য জনঘনত্ব কমানো, শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ এবং সমন্বিত নগর ও পরিবহন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পুরান ঢাকায় ছড়িয়ে থাকা ছোট কারখানা, রাসায়নিক গুদাম ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিতভাবে কেরানীগঞ্জ বা অন্য উপযুক্ত এলাকায় স্থানান্তর করা গেলে যানবাহনের চাপ কমবে। একই সঙ্গে বুড়িগঙ্গাসহ আশপাশের নদীপথকে কার্যকর পরিবহন নেটওয়ার্কে যুক্ত করা এবং রেলভিত্তিক গণপরিবহন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
রিকশা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিনি বলেন, লাইসেন্স ও নম্বরপ্লেটের আওতায় এনে রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা গেলে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কার্যকর করা সহজ হবে। বর্তমানের অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে শুধু এআই ক্যামেরা বসিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
তার মতে, পুরান ঢাকার সংকট মূলত নগর পরিকল্পনার সংকট। তাই ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বের অন্যান্য পুরোনো শহরের মতো পুরান ঢাকার কিছু অংশ পুনঃপরিকল্পনা ও পুনর্গঠনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
‘জনঘনত্ব কমানো, শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ, নদীপথ ও রেলভিত্তিক পরিবহন সম্প্রসারণ এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা ছাড়া পুরান ঢাকার যানজট সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়’, বলেন তিনি।


