আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১৩তম সংসদ নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে বাংলাদেশে আসছেন বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষক।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আহ্বানের বিদেশি পর্যবেক্ষক এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নিবন্ধনের সময়সীমা ১৭ জানুয়ারি শেষ হয়েছে। এই আহ্বানের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০টি দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং সাতটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইসি। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ ও সংস্থা তাদের অংশগ্রহণের কথা নিশ্চিত করেছে।
নির্বাচন কমিশন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন’ পাঠানোর বিষয়ে চুক্তি সই করেছে। এই মিশনটিই হবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক দল। সরকারি সূত্র মতে, মোট বিদেশি পর্যবেক্ষকের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষকের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ।
ইইউ নেতৃত্বাধীন পর্যবেক্ষক মিশন
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে, এতে প্রায় ২০০ জন সদস্য থাকবেন। ইইউ মিশনের ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক ইতোমধ্যে নির্বাচনের আগের পরিবেশ পর্যবেক্ষণের জন্য দেশের ৬৪টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছেন। এই পর্যবেক্ষকরা ভোটের দিন এবং ভোট গণনা প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাঠে থাকবেন।
নির্বাচনের প্রায় এক সপ্তাহ আগে আরও ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক এসে পৌঁছাবেন। এ ছাড়া, ভোটগ্রহণের ঠিক আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইইউ মিশনের সঙ্গে কানাডা, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ডের পর্যবেক্ষকরাও যোগ দেবেন। ভোটের দিন ইইউ দলটি সারা দেশে ভোটগ্রহণ, গণনা এবং ফলাফল একত্রীকরণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে।
কমনওয়েলথের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল
কমনওয়েলথ ১৭ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ দল পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই দলের নেতৃত্বে থাকবেন কমনওয়েলথভুক্ত কোনো একটি দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এই প্রতিনিধি দলে কমনওয়েলথের বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পার্লামেন্ট সদস্য এবং সুশীল সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা থাকবেন।
অন্যান্য দেশ ও সংস্থার অংশগ্রহণ
চীন, তুরস্ক, রাশিয়া, ইরান, ফিলিপাইন, ভুটান এবং মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে পর্যবেক্ষক পাঠানোর কথা নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে চীন, রাশিয়া ও ফিলিপাইন থেকে দুজন করে এবং তুরস্ক থেকে সাতজন পর্যবেক্ষক আসবেন। ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) থেকেও দুজন পর্যবেক্ষক আসার কথা নিশ্চিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে ওআইসি এবং এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস তাদের পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে। এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) যৌথভাবে ৩০ জনের বেশি পর্যবেক্ষক পাঠাতে পারে। অবশ্য তাদের চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো নিশ্চিত হয়নি। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমন্ত্রিত ৩০টি দেশের নির্বাচন কমিশনের অনেকের কাছ থেকে এখনো উত্তর আসার অপেক্ষায় আছেন তারা। একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আশা করছি আমন্ত্রিত দেশগুলোর অন্তত অর্ধেক তাদের পর্যবেক্ষক পাঠাবে।’
ভিসা ও লজিস্টিক ব্যবস্থা
ইসির আহ্বানে নিবন্ধিত বিদেশি পর্যবেক্ষকদের তালিকা নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত করে ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে এই পর্যবেক্ষকরা ‘অন-অ্যারাইভাল’ ভিসা পাবেন এবং তারা নিজেদের খরচ নিজেই বহন করবেন।
তবে নির্বাচন কমিশন যাদের আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তাদের বিমান ভাড়া ছাড়া বাকি খরচ কমিশন বহন করবে। এর মধ্যে ৩০ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা তাদের প্রতিনিধি এবং তাদের সঙ্গে থাকা একজন করে কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষকদের সংখ্যার ওপর কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই।
অন-অ্যারাইভাল ভিসা পুনরায় চালু
এদিকে, বিদেশিদের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা স্থগিত রাখার আগের সিদ্ধান্ত সরকার বাতিল করেছে। ১২ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সার্কুলারে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা বহাল থাকবে। তবে বিমানবন্দরে বিদেশিদের কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে।
দেশে এবং বিদেশে উচ্চ রাজনৈতিক গুরুত্বের মাঝে, এই বিশালসংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বিশ্বজুড়ে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।


