নির্বাচনের নারী প্রার্থীরাই দেশের ‘সবচেয়ে সাহসী মানুষ’

নির্বাচনের নারী প্রার্থীরাই দেশের ‘সবচেয়ে সাহসী মানুষ’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নারী প্রার্থীদের সম্মাননা দিয়েছে অ্যাকশনএইড ও প্রথম আলো। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির দাবি উঠেছে।

বৃহস্পতিবার ঢাকার একটি হোটেলে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ সংলাপ ও সম্মাননা অনুষ্ঠানের আলোচনায় এই দাবি উঠেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী বাস্তবতার প্রসঙ্গ টেনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। অথচ সবশেষ সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এই হার গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য সতর্কবার্তা।

বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ প্রথম আলো যৌথভাবে এই সংলাপ ও সম্মাননার আয়োজন করেছিল। এতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নারী প্রার্থীদের সম্মাননা দেওয়া হয়।

আলোচনায় বক্তরা বলেন, দেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে কেবল সুযোগ নয় বরং নারীর নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক মাঠে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর এজন্য দেশের নীতিনির্ধারক রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

এবারের নারী দিবসের জাতীয় প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী কন্যার অধিকার

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘ভোটার হিসেবে নারী গুরুত্বপূর্ণ হলে নেতৃত্বে তাদের সমস্যা কোথায়? আমরা নারীকে এখনো যোগ্য মর্যাদার আসনে বসাতে পারিনি। যে দেশের জন্ম হয়েছিল সমতা ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে, কিন্তু নারী সেই অধিকার থেকে ছিটকে পড়ছে। আমরা চাই জনগণের প্রতিনিধি হয়ে নারী পুরুষ উভয়ই যেন নারীর অধিকারের কথা বলেন।

এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীদের পাশে নাগরিক সমাজ গণমাধ্যমের আরও শক্তভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল বলে মনে করেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান।

তার প্রত্যাশা আগামী নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ উপস্থিতি আরও ব্যাপকভাবে বাড়বে।

আরও পড়ুন

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবিরের মতে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীরাই এদেশের সবচেয়ে সাহসী মানুষ। কারণ, নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তারা ভোটের মাঠে নেমেছেন, থেকেছেন।

তিনি বলেন, ‘জয়ের সংখ্যার চেয়েও বড় বিষয় হলো, এই নারীরা প্রতিকূল পরিবেশের মাঝেও একটি নতুন পথ তৈরি করেছেন। তবে আমরা শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি দেখতে চাই না, একটি প্রভাবশালী পরিবর্তন চাই। নারীর নিরাপত্তা মর্যাদা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার মতে, যে সমাজে নারীরা অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে সেখানে কেবলভালো মেয়েরইমেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পরাজয়ের নামান্তর।

রুমিন বলেন, ‘রাষ্ট্র সমাজ বদলাবে, কিন্তু তার আগে পরিবারের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যাতে কোনো নারী নিজ ঘরে বৈষম্যের শিকার না হন। আমরা শক্তিশালী নারীকে কন্যা বা বোন হিসেবে দেখতে চাই, কিন্তু সহযোদ্ধা হিসেবে নয়এই চিন্তাধারা বদলাতে হবে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অনুপস্থিতির কাঠামোগত কারণগুলো তুলে ধরেন।

তার মতে, অনেক রাজনৈতিক দল নারীদের কেবলপ্রতীকীহিসেবে ব্যবহার করে। তৃণমূল পর্যায়ে নারী কর্মীরা সক্রিয় থাকলেও মনোনয়নের সময় পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো আবার পুরুষদেরই বেছে নেয়। এছাড়া সংরক্ষিত আসনের নারীরা সরাসরি নির্বাচিত না হওয়ায় তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা খর্ব হয় এবং দায়বদ্ধতাও জনগণের চেয়ে দলের প্রতি বেশি থাকে।

তিনি আরও বলেন, ‘অনলাইন হেনস্তা বা সাইবার বুলিং দেখে অনেক তরুণী রাজনীতিতে আসার সাহস হারাচ্ছেন। তাই একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য।

বাসদ (মার্কসবাদী) নেত্রী সীমা দত্ত বলেন, ‘কৃষি থেকে গার্মেন্টস; সবখানে নারীদের তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা হয়। সমান মজুরি শ্রম আইনে অনানুষ্ঠানিক খাতের নারীদের স্বীকৃতির অভাব এবং সংস্কার প্রক্রিয়ায় নারীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল, নাট্য সংগঠনপালাকার’-এর পরিবেশনায় ইন্টারেক্টিভ ফোরাম থিয়েটারচেনা পরবাস

এতে অভিনয়ের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এবং নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের প্রতিকূলতার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। নাটকটির প্রতিটি দৃশ্য শেষে উপস্থিত নারী অধিকার কর্মী, বিশেষজ্ঞ, নারী প্রার্থী নীতিনির্ধারকরা সরাসরি সংলাপে অংশ নেন, যা কেবল সমস্যার চিত্রায়ন নয় বরং সমাধানের পথনকশা তৈরিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

সংলাপে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার চিত্র উপস্থাপন করেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশএর উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইক্যুইটি টিম লিড মরিয়ম নেসা।

বিভিন্ন গবেষণা জরিপের সূত্র ধরে তিনি দেখান, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেই অন্তত ২৭২ জন নারী কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৭০ জন ধর্ষণের শিকার।

এছাড়া দেশের ৩৯ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠিত না হওয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সেখানে বলা হয়, এবারের নির্বাচনে সাতজন নারী নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে এই একই সংখ্যক নারী নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এবার নারী প্রার্থীর হার মাত্র দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ হাই কমিশনের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইজার তাহেরা জাবীন, ইউএনডিপি বাংলাদেশএর সিনিয়র জেন্ডার অ্যানালিস্ট শারমিন ইসলাম, জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভি রাখসান্দ এবং জাতীয় রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের সাদাফ উপস্থিত ছিলেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর