পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক অধিকারসহ মৌলিক মানবাধিকারকে অস্বীকার করার ‘খেলা’ এখনো চলছে বলে মনে করেন বেসরকারি সংস্থা এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
তিনি বলেন, ‘এই খেলা শুরু করেছিল পাকিস্তানি শাসকরা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়েও তা চালিয়ে নেওয়া হয়েছে। এমনকি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে যে নতুন বন্দোবস্তের কথা বলা হয়েছে সেখানেও সাধারণ মানুষ, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, অধিকারহারা, নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষেরা অনুপস্থিত।’
বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারহীনতা সংস্কৃতি’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন।
শামসুল হুদা বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার বিষয়গুলো সবসময় উহ্য থেকে গিয়েছে। ওই অঞ্চলের গণমানুষের অধিকার সুরক্ষার জন্য যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করা হয়েছিল সেটিরও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।’
অন্তর্বতীকালীন সরকারকে বিগত ৫০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের উপর সংগঠিত হত্যা, ভূমি দখল, সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাগুলো তদন্তের জন্য একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের আহ্বানও জানান তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য দীপায়ন খীসার সঞ্চালনায় এবং যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম চৌধুরী, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরিন হক, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসানসহ অন্যরা।
জনসংহতি সমিতির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ১৯৭৬-৯৭ পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে চালানো হত্যাযজ্ঞ, দুই দশকে কমপক্ষে এক লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়া, গত ২৭ বছরে পাহাড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করেন খায়রুল ইসলাম চৌধুরী।
এসব ঘটনার কোনোটিরই সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এই ধরনের কাঠামোগত বিচারহীনতা দূর করতে হলে শুধু নীতি নয়, বরং আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন।’
তার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা মানে বাংলাদেশের সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।
সোহরাব হাসান বলেন, ‘রাষ্ট্রের সকল মানুষের মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এ দায়িত্ব যদি রাষ্ট্র সঠিকভাবে পালন করত তাহলে আজকে আলাদা করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের নিয়ে আলোচনা করতে হতো না।’
‘পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনয়নের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করা হয়েছিল। এ চুক্তি বাস্তবায়নে চুক্তির অপর পক্ষ জনসংহতি সমিতি বা পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের পক্ষ থেকে কোন বাধা দেওয়া হচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রের সদিচ্ছার অভাবের কারণে এ চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না।’
তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে দেশের গণমানুষের অধিকার সংরক্ষণ করার জন্য রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান।
দেশের কোনো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ‘সংখ্যালঘু‘ শব্দটি চাপিয়ে দেওয়ার মানে সেই জনগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার, মানবিক মর্যাদাকে অপমান করা বলে মনে করেন শিরীন হক।
তিনি বলেন, ‘সীমান্ত রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী বাহিনী রাখা দরকার। কিন্তু সে বাহিনী যেন পাহাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কোনো ব্যাঘাত তৈরি না করে।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল তা আর এখন দেখতে পাচ্ছি না।’
তবে বাহাত্তরের সংবিধানের ‘দেশের জনগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন’ ধারা পরিবর্তন করে প্রস্তাবিত জুলাই সনদে ‘বাংলাদেশ একটি বহু জাতিগোষ্ঠীর, বহু সংস্কৃতির দেশ যেখানে সকল জনগোষ্ঠী তাদের অধিকার চর্চা করতে পারবে’–এমন ধারা যুক্ত করাকে আশাব্যঞ্জক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার সংরক্ষণ এবং শান্তি ফেরাতে একমাত্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনীই পারে বলে মনে করেন ইফতেখারুজ্জামান।
সেনাবাহিনীর প্রতি প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘বিগত ৪০ বছরে আপনারা ১০টি দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে সফলতার সঙ্গে কাজ করেছেন। সারা বিশ্বে যদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে পারেন তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করছেন না কেন?’
‘সেনাবাহিনীর যদি সদিচ্ছা থাকে তাহলে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না, সেনাবাহিনীই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা দিয়ে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে।’


