সম্প্রতি যে প্রক্রিয়ায় এবং যে ব্যক্তিকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাগরিক কোয়ালিশন।
রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানানো হয়।
সেখানে বলা হয়, ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তিত নেতৃত্ব আসবে এটাই স্বাভাবিকI তবে সম্প্রতি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে– যে প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হয়েছে এবং যে ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা দেশের নাগরিক সমাজকে উদ্বিগ্ন করেছেI’
গত দেড় দশক সরকারের হাতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে সেখানে বলা হয়, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত কতিপয় অলিগার্ক কোটি কোটি মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয় লুট করে দেশের বাইরে পাচার করেছেনI ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমান বর্তমানে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশিI বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের সঞ্চয় ফেরত দিতে পারছে না গত বেশ কয়েক বছর ধরেI
রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগসাজশের সরাসরি ফল এই সংকট ও নৈরাজ্য I বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অসহনীয় মূল্যস্ফীতি নিয়ে যে অর্থনৈতিক সংকটে দেশ এখনো ধুঁকছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বের সীমাহীন দুর্নীতি ও অদক্ষতাI
এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের জনগণ আশা করেছিল যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে যদি নেতৃত্ব পরিবর্তন করা হয়, তবে গভর্নর হিসাবে এমন একজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে যিনি শুধু অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে দক্ষ ও অভিজ্ঞই নয়, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলের চাপ অগ্রাহ্য করে স্বাধীনভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব দিতে পারবেনI
নাগরিক কোয়াশিন বলছে, ‘কিন্তু আমরা বিস্ময়ের লক্ষ্য করলাম গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকার এমন একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দিলেন যার দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বা আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কোনো সম্যক অভিজ্ঞতা বা বিশেষায়িত দক্ষতা নেইI এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হলোI কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসাবে একজন ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়া আমাদের দেশেই বিরল না, আমাদের অর্থনীতির সাথে তুলনীয় অন্য কোনো দেশেও এরকম উদাহরণ নেইI’
গভর্নর হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি তৈরি পোশাকশিল্প, আবাসন, আটাব, ঢাকা চেম্বারের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন একজন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি হিসেবেI এক্ষেত্রে নানা মহল থেকে ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ এর শঙ্কা উঠেছে, যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে কোনো নীতি বিভিন্ন ব্যাবসায়ী খাতকে সরাসরি প্রভাবিত করেI
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সবচেয়ে আশংকার ব্যাপার হচ্ছে নতুন নিয়োগ পাওয়া গভর্নর নিজের ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ বিবেচনায় ঋণ (যার পরিমাণ ৮০ কোটি টাকার বেশি) পুনঃতফসিল করেছিলেন। এটি আইনগতভাবে সিদ্ধ হলেও বিশাল অংকের ঋণের দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের মতো সংবেদনশীল পদের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব নেওয়া নৈতিকতার মানদণ্ডে সঠিক কিনা সেই প্রশ্ন থেকে যায়I’
এছাড়াও বিভিন্ন গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে সেখানে বলা হয়, নবনির্বাচিত গভর্নর সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেনI সরকারি দলের একজন সক্রিয় সদস্য কিভাবে স্বাধীন ও পেশাদারত্বের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের নেতৃত্ব দিতে পারবে সে ব্যাপারে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিকI
নাগরিক কোয়ালিশন দৃঢ়ভাবে মনে করে, দেশের ইতিহাসে প্রথম ব্যবসায়ী হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে এ নিয়োগের মাধ্যমে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাস্তবে আবারও কর্তৃত্ববাদী চৌর্যতন্ত্রের আমলের মতো জাতীয় স্বার্থের তুলনায় খেলাপি ঋণ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নির্ভর ব্যবসায়ী লবির করায়ত্ত ও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হলো।
বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক খাতের সুশাসন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের যে অঙ্গীকার করেছে, তার সঙ্গে এ জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্বপুষ্ট ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ প্রদান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
নাগরিক কোয়ালিশন সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছে যে, অর্থনৈতিক ঝুঁকি, ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ ও অন্যান্য সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নিয়োগ পুনর্বিবেচনা করা হোকI এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে একটি সার্চ কমিটি করে ও সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে শুনানি করার পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ করা হোকI


