জুবায়ের তানিন, দুবাই থেকে
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ কেবল একপাশেই হয়, ব্যাপারটা রীতিমতো প্রতিষ্ঠিতই। টি-টোয়েন্টিতে শেষ ১৬ ম্যাচের ১১টাই জিতেছে ভারত, এই পরিসংখ্যানও সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে। কিন্তু রবিবার দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে এশিয়া কাপের ফাইনাল হাজির হলো ভারত-পাকিস্তানের ধ্রুপদী লড়াই নিয়ে। ১৪৭ রানের লক্ষ্য টপকাতে ভারতকে ব্যাট করতে হয়েছে ১৯.৪ ওভার পর্যন্ত। শুরুতে চাপে পড়লেও তিলক ভার্মার ৫৩ বলে ৬৯* রানের ইনিংসে পাঁচ উইকেট হাতে রেখে ম্যাচ জিতল ভারত। দুই বল হাতে রেখে পাওয়া এই জয় তাদের এনে দিল এশিয়া কাপের নবম শিরোপা, তাও অপরাজিত হিসেবে।
এতদিন ভারত-পাকিস্তানের লড়াইয়ে যে জিনিসটা মিসিং ছিল, নাটকীয়তা; সেটাই ফিরে এলো আজ দুবাইয়ের মাঠে। শেষ দুই ওভারে ভারতের প্রয়োজন ছিল ১৭ রান। এক ছক্কায় ম্যাচ নিজেদের দিকে নিয়ে এসেও ১৯তম ওভারের শেষ বলে ক্যাচ দেন শিভাম দুবে। দুই ছক্কা, দুই চারে ২২ বলে ৩৩ রান করেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। এরপর তিলক শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলে দারুণ এক পুলে ছক্কা মেরে পাকিস্তানকে ছিটকে দেন লড়াই থেকে। হারিস রউফের করা সেই ওভারের পরের দুই বলেই ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায় ভারতের। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে রিংকু সিং নিয়েছেন উইনিং শট।
গত জুলাইয়ে পেহেলগাঁওয়ের সন্ত্রাসী হামলায় দুই দেশের সম্পর্কে আরো শীতলতা নেমে না এলে, ভারত হয়তো ঘরের মাঠেই জিততে পারত এবারের এশিয়া কাপ। বাধ্য হয়েই তাই এসিসি এবারের এশিয়া কাপ আয়োজন করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। অবশ্য মাঠের ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তানের লড়াই আগের মতো জমে না, এই প্রমাণ পাওয়া গেছে এবারের এশিয়া কাপে দুই দলের দুইবারের দেখায়। কিন্তু দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বির লড়াইটা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব গ্রুপ রাউন্ডের ম্যাচে পাকিস্তানের অধিনায়ক সালমান আগার সাথে হাত না মেলানোতে। এমনকি ম্যাচ শেষে দুই দল নিয়ম মাফিক হাত মেলানোর তোয়াক্কাও করেনি ভারত দল। ম্যাচ জিতে সোজা ড্রেসিংরুমে।
সে নিয়ে কত কাণ্ড! গুঞ্জন ওঠে পাকিস্তান টুর্নামেন্ট বয়কট করবে। এসিসি ও পিসিবি সভাপতি মহসিন নাকভি পাকিস্তান দলের সাথে বৈঠকেও বসেছেন, যে কারণে প্রায় দেড় ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয়েছে ওমানের বিপক্ষে তাদের ম্যাচটা। এরপর পাকিস্তানের সাথে দ্বৈরথ নিয়ে সূর্যকুমারের মন্তব্যও যোগ করেছিল আরেকটু কথার লড়াই। পেহেলগাওয়ে সন্ত্রাসী হামলার সেই ঘটনারে জেরে জল গড়িয়েছে আরো অনেক দূর। ফাইনালের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে আসেই ভারত, হয়নি কোনো ফটোসেশনও।
এসব এক পাশে সরিয়ে রাখলে টুর্নামেন্টের মাঠের লড়াইয়ে ভারতের ধারেকাছেও ছিল না পাকিস্তান। যদিও ফাইনালে ১৪৫ রান ডিফেন্ড করতে নেমে ভারতকে চাপে ফেলে দিয়েছিল সালমানের দল। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই ফাহিম আশরাফের স্লোয়ারে বিভ্রান্ত হয়ে ক্যাচ দিয়েছেন আগুনে ফর্মে থাকা অভিষেক শর্মা। তিনে নামা সূর্যকুমারও একইভাবে ড্রাইভ করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন মিড অফে সালমানের হাতে। শুভমান গিল তৃতীয় শিকার ফাহিমের।
যদিও সেই চাপ ভারত দারুণভাবে সামলে ওঠে তিলক-সাঞ্জুর ৫৭ রানের জুটিতে। আবরারের বলে সাঞ্জু ক্যাচ তুলে জীবন পেয়েও অবশ্য ইনিংস বড় করতে পারেননি। ২১ বলে ২৪ রান করেছেন এই ডানহাতি ব্যাটার। তবে তিলক ভার্মা প্রায় একা হাতেই দলকে জিতিয়েছেন। তিন ছক্কা আর তিন চারে ৪০ বলে ছুঁয়েছেন ক্যারিয়ারের চতুর্থ ফিফটি। মাঠে ছিলেন শেষ পর্যন্ত। রিংকুর ব্যাটে শিরোপা জেতার আগে শিভামের সাথেও গড়েছেন ম্যাচের মোড় ঘোরানো ৪০ বলে ৬০ রানের জুটি।
এর আগে টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে চলতি এশিয়া কাপে সর্বোচ্চ ও নিজেদের সর্বশেষ ২৬ ইনিংসে ওপেনিং জুটিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটির দেখা পেয়েছে পাকিস্তান। সাহিবজাদা ফারহান ও ফখর জামান ৫৮ বল থেকে তুলেছেন ৮৪ রান। পাওয়ারপ্লেটা নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দুজন শুরু করেন হাত খুলে খেলা। বিশেষ করে ফারহান, ভারতের বিপক্ষে পেয়েছেন টানা দ্বিতীয় ফিফটির দেখা। ৩৮ বলে ৫৭ রানের ইনিংসটা সাজিয়েছেন তিন ছক্কা আর পাঁচটি চারে। অবশ্য বরুণ চক্রবর্তীকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ধরা পড়েছেন তিলক ভার্মার হাতে। দুইটি করে ছক্কা ও চারে ৪৬ রান করা ফখরকেও ফিরিয়েছেন এই অফস্পিনার।
পাকিস্তানের ব্যাটিং হাইলাইটস বলতে কেবল এই দুজনই। মিডল ওভারের ব্যাটিং এপ্রোচই শেষ পর্যন্ত ভুগিয়েছে তাদের। নইলে ওপেনিং জুটিতে ৮৪ রান তোলার পরেও কেন একটা দল ১৬০ বা তার বেশি স্কোর করতে পারল না, সেই প্রশ্ন তোলাই যায়। ফখর যখন আউট হন তখন পাকিস্তানের সংগ্রহ ছিল ২ উইকেটে ১১৩ রান।
কিন্তু সেখান থেকে কুলদীপ যাদব-অক্ষর প্যাটেলদের স্পিন জাদুতে পাকিস্তান বাকি ৮ উইকেট হারিয়েছে মাত্র ৩৩ রানের ব্যবধানে। অবিশ্বাস্য এই ব্যাটিং ধসের দিনে সাইম আইয়ুবের ব্যাট থেকে এসেছে ১৪ রানের ইনিংস। অধিনায়ক সালমান আগা থেকে শুরু করে মোহাম্মদ নওয়াজসহ শেষ আট ব্যাটার আউট হয়েছেন সিংগেল ডিজিটে। মিডল ওভারে ৮৮ রানে প্রথম পাঁচ উইকেট হারানোর পর ডেথ ওভারে শেষ পাঁচ উইকেট পড়েছে মাত্র ১৩ রানের ব্যবধানে। কুলদীপ একাই নিয়েছেন চার উইকেট। তার সাথে বাকি দুই স্পিনার অক্ষর-বরুণ ও বুমরাহ নিয়েছেন দুটি করে উইকেট।


