তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বাংলাদেশকে সহায়তা ও পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে চীন। পাশাপাশি প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট অন্য কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে বিশেষজ্ঞ সহযোগিতারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং।
সেই সঙ্গে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা, জলবিদ্যাগত পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঢাকা-বেইজিং সহযোগিতা আরও গভীর করতে রাজি হয়েছে দুই পক্ষ। এ ছাড়া উভয় পক্ষ সামুদ্রিক বিষয়াবলিতে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।
চীনের প্রিমিয়ার লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর ঘিরে শুক্রবার এক যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বেইজিং সফরে শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া চীনের স্টেট কাউন্সিলের প্রিমিয়ার লি কিয়াং ও দেশটির জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান চাও ল্যুচির সঙ্গেও তিনি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
বৈঠকগুলোতে উভয় পক্ষ চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করে এবং ঐকমত্যে পৌঁছায়।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৭৫ সালে ঢাকা-বেইজিং কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে চীন ও বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা সুদৃঢ় করেছে, ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব আরও শক্তিশালী করেছে এবং ফলপ্রসূ বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা এগিয়ে নিয়েছে। ফলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।
গত ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন সরকার। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন সরকারের শাসনকাজ ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে তারা।
ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
এ সময় বিদ্যমান সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে আরও উন্নীত করে নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের লক্ষ্যে চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায় গড়ে তুলতে রাজি হয় দুই পক্ষ।
দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের পারস্পরিক সফরের গতি বজায় রাখা, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময় বৃদ্ধি এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারেও সম্মত হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঢাকা ও বেইজিং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একটি কৌশলগত সংলাপ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও যৌথভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
উভয় পক্ষ নিজ নিজ মৌলিক জাতীয় স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়ে একে অপরকে দৃঢ় সমর্থন জানিয়েছে। দুই দেশই জোর দিয়ে বলেছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবের কর্তৃত্ব প্রশ্নাতীত এবং তা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ‘এক চীন’ নীতির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছে, বিশ্বে একটিই চীন রয়েছে, তাইওয়ান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সরকারই গোটা চীনের একমাত্র বৈধ সরকার।
‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ প্রতিষ্ঠার যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টার কঠোর বিরোধিতা করে ফের তাইওয়ান ও চীনের একত্রীকরণ অর্জনে সমর্থন জানিয়েছে ঢাকা।
বাংলাদেশের সব জনগণের প্রতি সুপ্রতিবেশী নীতি অব্যাহত থাকবে জানিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়েছে চীন। বাংলাদেশের জনগণ তাদের জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্বাধীন উন্নয়নপথ বেছে নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার প্রতিও চীন সম্মান জানিয়েছে।
উভয় পক্ষ বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া এবং আধুনিকায়নের অভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে। চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে আরও কার্যকর সমন্বয় করবে এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ছোট কিন্তু কার্যকর প্রকল্পও এগিয়ে নেবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন এবং কৃষিখাতের সক্ষমতা ও সহনশীলতা বৃদ্ধিতে চীন সমর্থন অব্যাহত রাখবে। সেইসঙ্গে দেশটি তার সক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমে সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।


