ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখার উদ্যোগ হিসেবে সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনাকে ঘিরে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে তার ভার্চুয়াল অংশগ্রহণ ও বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকটি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।
এর আগে রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ত্রিবেদী। বৈঠকে দুই পক্ষ সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। এ সময় ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানকে ঘিরে বাংলাদেশের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর নয়াদিল্লির অবস্থানও তুলে ধরেন ভারতীয় হাইকমিশনার।
পরপর দুই দিনের এই বৈঠককে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে যোগাযোগ ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক মতপার্থক্য ও অস্বস্তি সত্ত্বেও ঢাকা ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে আগ্রহী।
উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সম্ভাবনা
ভারতীয় হাইকমিশনের সূত্রগুলো জানিয়েছে, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়—দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহী নয়াদিল্লি। দুই দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একে-অপরকে সহযোগিতা করে আসছে। সেই সহযোগিতা এগিয়ে নিতে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে নিয়মিত সংলাপ প্রয়োজন বলে মনে করছে ভারত।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী ও ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকটি ইতিবাচক হলে অদূর ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে আরও উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের পথ খুলতে পারে।
তবে শেখ হাসিনার ভারত থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিষয়টি এখনও দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল ইস্যু।
৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ও বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করেন। এতে ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ঘিরে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করে।
এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠককে তাৎক্ষণিক বিরোধের বাইরে গিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার একটি সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার এই উদ্যোগ নয়াদিল্লির জন্যও ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
সম্পৃক্ততার পরীক্ষা
ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের একটি বাস্তববাদী কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, মতপার্থক্য থাকলেও প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক পরিচালনার জন্য সংলাপের বিকল্প নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নয়াদিল্লি একাধিকবার বলেছিল, ঢাকায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত যে কোনো সরকারের সঙ্গে তারা কাজ করবে। ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর ভারতীয় সংসদের স্পিকার বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ঢাকায় ওই পদক্ষেপকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হয়েছিল।
তবে, এরপর সীমান্তে উত্তেজনা, ‘পুশইন’ নিয়ে অভিযোগ এবং ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল অংশগ্রহণ—এসব ঘটনা দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ সরকার এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, যা ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
দুই দেশই জানে, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য যতই গভীর হোক, তা মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, সেই উপলব্ধিকে কার্যকর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততায় রূপ দেওয়া।
আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ
নয়াদিল্লির প্রকাশ্য বক্তব্য সাধারণত গঠনমূলক থাকলেও ঢাকার দৃষ্টিতে এর সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও বাড়াতে পারে। এতে দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনও কঠিন হয়ে পড়বে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠককে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুই দেশের বিস্তৃত সমস্যাগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনার একটি পথও তৈরি হতে পারে।
ঢাকার অবস্থানও এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট—গুরুতর মতপার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনার পথ খোলা রাখতে চায়।
এখন কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর নয়াদিল্লির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তাদের মতে, সম্পর্কের টানাপোড়েন কমিয়ে আনতে ভারতের পক্ষ থেকেও একই ধরনের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন প্রয়োজন।


