সকাল ১১টার পর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে কড়া নিরাপত্তা। অতিরিক্ত পুলিশ, ব্যারিকেড ও উৎসুক মানুষের ভিড়ে এলাকাটি আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। সংবাদ সম্মেলন শেষে বাতাসে ভাসছিল টানটান উত্তেজনা।
আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে তখন আদালতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। কার্যালয়ের প্রধান ফটকের বাইরে শত শত মানুষের ভিড় জমে যায়। ভিড় থেকে প্রশ্ন আসছিল, ‘ডেভিড ইমন নাকি?’ পাশ থেকে কেউ নিশ্চিত হয়ে উত্তর দিচ্ছিলেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে।’
সামান্য এই আলাপে মিশে ছিল দীর্ঘদিন পর আতঙ্ক থেকে মুক্তির স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস। অপরাধ জগতের অন্যতম ত্রাস ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার হওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে তৃপ্তি জন্মেছে।
গত ১৩ জুন পাহাড়তলী এলাকায় মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার মাধ্যমে এই ঘটনার সূত্রপাত। মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে নামে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জড়িতদের শনাক্ত করা হয়। ধারাবাহিকতায় গত ২২ জুলাই মামলার অন্যতম এজাহারভুক্ত আসামি মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ধামা ইলিয়াস কুখ্যাত সন্ত্রাসী রায়হানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তার বিরুদ্ধে ৫টি হত্যাসহ মোট ২১টি মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর আদালত তাকে দুই দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) রাসেল জানান, রিমান্ডে ধামা ইলিয়াস গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। সে জানায়, রায়হান নোয়াখালীতে অবস্থান করছে। ডেভিড ইমন যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে পারে। এই তথ্যের সূত্র ধরে জেলা ডিবি পুলিশের একটি দল দ্রুত যশোর সীমান্তে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়।

ধামা ইলিয়াসের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৯ জুলাই যশোর কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়। যশোর জেলা পুলিশের সহায়তায় চট্টগ্রামের মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার সঙ্গে মো. শামীম, আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল ও মো. সাফায়েত হোসেন নামে তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৫ বছর বয়সী ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগর, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়া এলাকায় সন্ত্রাসী রাজত্ব চালিয়ে আসছিল। তার বিরুদ্ধে খুন, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে।
গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে ব্যবহৃত অস্ত্রের হদিস মেলে। ৩০ জুলাই রাত সাড়ে ৩টার দিকে ফটিকছড়ি থানার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের পাইট্রাল টিলাপাড়ায় একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালায়। সেখান থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল, ২টি দেশীয় এলজি ও বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘সন্ত্রাস ও অস্ত্রধারী অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে।’
পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে প্রখর রোদ উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মাঝে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অন্যরকম আনন্দ দেখা যায়। সেখানে অপেক্ষমাণ এক নারী বলেন, ‘অনেক দিন পর মনে হচ্ছে চট্টগ্রাম হয়তো শান্ত হতে পারে। সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজিতে আমরা অতিষ্ঠ ছিলাম। সব সময় ভয় নিয়ে চলতে হতো।’
সেখানে উপস্থিত এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরবে। তবে শুধু একজনকে ধরলে হবে না, পুরো অপরাধ চক্রের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলতে হবে।’
পৌনে ১২টার দিকে ডেভিড ইমনকে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় মানুষের চোখে নিরাপদ নগরীর স্বপ্ন ছিল। চট্টগ্রামের মানুষের কাছে এই গ্রেপ্তার ভয়হীন জীবনের এক নতুন প্রত্যাশা।


